মৌলভীবাজারের ৯২ চা বাগানের অর্ধেকেরই রাস্তা সংস্কার হচ্ছে না

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৫
মহাজোট সরকারের সাড়ে চার বছর চলে গেলেও মৌলভীবাজারের চা-বাগান এলাকার রাস্তাগুলোর তেমন কোন সংস্কার কাজ হয়নি। বিএনপি শাসনামলের শেষের দিকে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর কল্যাণে চা-বাগানগুলোর রাস্তার উন্নয়ন হলেও বর্তমানে এসব রাস্তা চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জেলার ৯২টি চা বাগানের ৪৮টি রাস্তাঘাটে কোন ধরনের সংস্কার কাজ না হওয়ায় চা অঞ্চল বলে খ্যাত এ জেলার রফতানি নির্ভর অর্থনীতি অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। এ নিয়ে অবহেলিত এসব বাগান শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। বাংলাদেশ চা বোর্ড প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চা বাগান কানেকটিং রোড প্রকল্পের (বাগানে রোড কমিটি বলে পরিচিত) অধীনে মৌলভীবাজার সদর থানা, রাজনগর, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা কুলাউড়া, জুড়ীর ৯২টি বাগানে সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করা হয়। এ পাঁচ বছরের উন্নয়ন কাজ অসমাপ্ত রেখে হঠাত্ করে নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৭ সালের শুরুর দিকে কাজ আবারও শুরু হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসায় তা পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসলে আবারও কাজ শুরু হয়। কিন্তু টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পাওয়া বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারি দপ্তরের টানাপোড়ন, প্রশাসনিক জটিলতা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্লিপ্ততাসহ নানা কারণে সড়ক নির্মাণ কাজে বাধা পড়ে। ফলে বিচ্ছিন্নভাবে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ বাগান এলাকার সড়কের নির্মাণের কাজের দায়িত্ব নিলে ও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় জেলার ৯২টি চা বাগানের ৪৮টি বাগানের যোগাযোগ সড়কের সংস্কার হয়নি। এর ফলে বাগান অধ্যুষিত এলাকার প্রায় তিন লাখ মানুষ নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের দাবিতে বৃহত্তর সিলেট বিভাগের ১৫৪টি বাগান শ্রমিকসহ অধিবাসীরা বিভিন্ন সময় সভা সমাবেশ করেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বরাবরে শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রতিনিধির মাধ্যমে দাবি জানানো হয়। এ দাবির প্রেক্ষিতে সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি প্রতিনিধি দল শ্রীমঙ্গল সফর করে চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন। কিন্তু এ জনবহুল ও রেল যোগাযোগের সহজ মাধ্যম বাণিজ্যিক শহর বলে পরিচিত শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন বাগানেও সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। এতে করে ব্যবসায়ীসহ বাগান সংশ্লিষ্ট মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার রাজনগর ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে চা-বাগান সংযোগ সড়ক, রাজনগর উত্তরভাগ ও ইন্দ্রানগর রাস্তার ৪৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সদর উপজেলার প্রেমনগর-দেওড়াছড়া চা-বাগান রাস্তার উন্নয়ন, গিয়াসনগর-মৌলভী চা বাগান সংযোগ রাস্তা উন্নয়ন ব্যয় ১৯ লক্ষ টাকা। কুলাউড়া গাজীপুর রাস্তা উন্নয়ন ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। কুলাউড়া শমসেরনগর আলীনগর চা বাগানের রাস্তা ৩০ লক্ষ ৮৮ লাখ টাকার উন্নয়ন। কমলগঞ্জ শমসেরনগর চাতলাপুর চা-বাগান সড়ক ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। কুলাউড়া জুড়ি ও বড়লেখা উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানের উন্নয়নে কুলাউড়া জুড়ি ও বড়লেখা সড়ক উন্নয়ন করে মৌলভীবাজার সওজ বিভাগ সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় কুলাউড়া বড়লেখা সড়কের কাঁঠালতলী মাধবকুণ্ড সড়ক উন্নয়নের লক্ষে ৮ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে ও চা-বাগান মালিক এসোসিয়েশন সূত্রে যে সকল বাগান এলাকার রাস্তায় সংস্কার কাজ করা হয়নি সেসকল বাগানের মধ্যে রয়েছে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার প্রেমনগর মৌলভী হামিদিয়া চা বাগান, রাজনগরে রাজনগর চা বাগান, ইন্ধানী চা বাগান, উত্তরভাগ চা বাগান, মাথিউড়া চা বাগান। কুলাউড়ার গাজীপুর লংলা, রতনা, কমলগঞ্জের ইসলামপুর, মুনশিবাজার, মিরতিঙ্গা, দেওড়াছড়া, আলী নগর, শমসেরনগর, চাতলাপুর। জুড়ির রেমা, কালেংগা, ফুলতলা, সাগরনাল, বড়লেখার শাবাজপুর, পাল্লারতল, বোবারতল, হামিদনগর, আয়েশাবাদ। শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট, হোসনাবাদ, খেজুরিছড়া, উদনাছড়া, আমরইল, ইমামবাড়ী, দিনারপুর, শমশেরনগর চা বাগান। সিন্ধুর খান ইউপি সদস্য সিতারাম বীন বলেন, ‘চল্লিশ বছর আগে যে বাগান ছিল এখনো সে বাগানই পড়ে রয়েছে। বাগানের রাস্তাঘাটের কোন উন্নয়ন হয়নি।’ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা পরিমল কুমার বাড়ৈ বলেন, চা বাগানের রাস্তাঘাটের উন্নতি হলে বেশি বেশি মাল রফতানি করা যেতো। এতে বাগানের উন্নতি হতো। বাংলাদেশ চা বোডের্র প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক মো. হারুন অর রশিদ সরকার জানান, ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ চা বোর্ডের ফি বছর ২৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু গত ২০০৭ সালের পর থেকে উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকার কারণে সরকারের বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগ নিজের ইচ্ছামতো কাজ পরিচালনা করছে। কথিত আছে চা বোর্ডে এক সময় রোড কমিটি নামে একটি শক্তিশালী কমিটি ছিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুন্নবী জানান, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে চা বাগানের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হবে। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘চা বাগানের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতি মাসেই আমরা চা-বাগান উন্নয়ন সমন্বয় সভা করে আসছি। বাগান মালিকদের সহযোগিতা পেলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা সম্ভব।’