কাদের মোল্লার রায় যে কোন দিন

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৭
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে কোন দিন মামলাটির রায় ঘোষণা করবে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গতকাল শেষ হয় আপিলের শুনানি। এদিকে আপিল বিভাগে বর্তমানে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষ আপিল করেছে। অপরদিকে মৃত্যু-দণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন কামারুজ্জামান। দুটি আপিলই শুনানির অপেক্ষায়। এ প্রসঙ্গে এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, সাঈদীর রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিই প্রথমে হবে। তিনি বলেন, কাদের মোল্লার আপিলে অনেকগুলো আইনগত বিষয় ছিল। সে সব বিষয়ে শুনানি হয়েছে। অ্যামিকাস কিউরিরা বক্তব্য দিয়েছেন। আপিল বিভাগ এখন এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে সাঈদী-কামারুজ্জামানসহ পরবর্তী আপিলগুলোর ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে না। এটর্নি জেনারেল বলেন, সামনে সুপ্রিম কোর্টের বড় ছুটি রয়েছে। এই ছুটিতেও আপিল শুনানি অব্যাহত রাখার আবেদন করা হবে কি না সে বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। প্রসঙ্গত গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি- এমন দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপরই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে ট্রাইব্যুনালের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। একইসঙ্গে আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির কথা ওই সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়। এরপরই কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ। পাশাপাশি বেকসুর খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করেন কাদের মোল্লা। গত পহেলা এপ্রিল এই আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। ৩৯ কার্য দিবসব্যাপী আপিলের ওপর শুনানি চলে। আপিলের শুনানিকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। একটি হলো, দণ্ড ঘোষণার পর আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আনা সর্বশেষ সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না? দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না? এই দুটি প্রশ্নের উপর আইনগত মতামত জানতে গত ২০ জুন সুপ্রিম কোর্টের শীর্ষ সাত আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ। অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, এডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সর্বশেষ সংশোধনী বৈধ এবং তা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে এডভোকেট টিএইচ খান ও এডভোকেট এএফ হাসান আরিফ বলেন, এ সংশোধনী তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অন্যদিকে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতের প্রতিফলন দেখা যায়। অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্যের পরই আপিলের ওপর আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপন শেষ করেন। গতকাল আপিলের ওপর সর্বশেষ বক্তব্য রাখেন এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম। শুনানিতে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে কাদের মোল্লার পাঁচটি অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলা হলেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। কেন দেয়া হলো না-তার ব্যাখ্যাও ওই রায়ে দেয়া হয়নি। এটর্নি জেনারেল বলেন, কাদের মোল্লা অপরাধ করেনি-এটাও আসামিপক্ষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধীর উপযুক্ত সাজা না হলে বিচার হয় না। তাই আমাদের আপিল গ্রহণ করে আসামির আপিল খারিজ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে এই আইনকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। তাই এটা নিয়ে কোন বিতর্ক বা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। প্রধান বিচারপতি ছাড়াও বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে তিন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান, এডভোকেট মুরাদ রেজা ও এডভোকেট মমতাজউদ্দিন ফকির ও আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও এডভোকেট শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। পরে এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, আপিলের অধিকার ‘যার যার তার তার’। আইন সংশোধনের মাধ্যমে কারো আপিল করার অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়নি। বরং এতে উভয়পক্ষ সমান সুযোগ পেয়েছে। আশা করি, আপিলে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ দণ্ড হবে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণে কাদের মোল্লাকে শাস্তি দেয়া অসম্ভব। এরপরও আপিলে তার শাস্তি হলে সেটা হবে বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি কালো দিন। উল্লেখ্য, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে পঞ্চম অভিযোগ (আলুব্দীতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ) এবং ষষ্ঠ অভিযোগ (হযরত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণ) দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া প্রথম অভিযোগ (পল্লব হত্যা), দ্বিতীয় অভিযোগ (কবি মেহেরুননিসা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা) ও তৃতীয় অভিযোগের (সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা) দায়ে কাদের মোল্লাকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। চতুর্থ অভিযোগ (ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড) থেকে তাকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।