ভূ-মধ্যসাগরে ভয়াবহ নৌকাডুবিতে সিলেটের ছয়জনসহ ৩৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলে তোলপাড় চলছে। এখনো অনেক নিখোঁজ রয়েছেন। এই ঘটনায় নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সিলেটের ‘ইয়াহিয়া ওভারসীজ’ জনপ্রতি ৮ লাখ টাকা করে নিয়েছে সরাসরি ফ্লাইটে ইতালি পাঠানোর শর্তে। কিন্তু ৩ দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়াতে নিয়ে রাখা হয় ৫ মাস। সেখানে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। প্রতিবাদ করায় এজেন্সির মালিক এনাম আহমেদ অনেকের কাছ থেকেই স্বজনকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ৩ লাখ টাকা করে আদায় করেছে। নৌকাডুবির ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানে তালা মেরে পালিয়ে গেছেন তিনি। তার সন্ধানে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি।
এদিকে সিলেটে ভুয়া এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। গতকাল পাঁচ মানব পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। মানব পাচারের সাথে জড়িত সিলেটে শতাধিক ভুয়া ট্রাভেলস ব্যবসায়ী রয়েছেন। ফলে বৈধ ব্যসায়ীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এসব ভুয়া ট্রেভেলস এজেন্সির কবলে পড়ে সিলেট অঞ্চলের বহু মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অনেকে জমি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে স্বজনকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে এখন নিঃস্ব।
প্রশাসনের অভিযান: অন্যদিকে দেরিতে হলেও প্রশাসন এসব ভুয়া এজেন্সির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। গতকাল সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার এলাকার ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সিটির অবৈধ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে অভিযান চালায় প্রশাসন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযান চলে। এ সময় ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সিটি থেকে তিনজন মানব পাচারকারী আটক করা হয় এবং তাদের এক মাসের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন ম্যাজিস্ট্রেট। আটককৃতরা হলেন— ইউসিএস অ্যাডুকেশনের হীরা, রিচ রিল্যাশন গ্রুপের মাহবুব এবং জাকির অ্যাডুক্যাশনের এক কর্মচারী। হেলাল চৌধুরী বলেন, মানব পাচার বন্ধে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লাইন্সেস-নিবন্ধনবিহীন ট্রাভেলসগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এই অভিযান চলবে।
আম্বরখানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে লাইসেন্স-নিবন্ধন না থাকায় কয়েকটি ট্রাভেলস এজেন্সিকে মোটা অংকের জরিমানা করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইরতিজা হাসানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে আম্বরখানার আবু সাইদ এন্টারপ্রাইজকে ত্রিশ হাজার, ট্রাভেল টাইমকে পঁচিশ হাজার টাকা, জিলানী এয়ার ইন্টারন্যাশনালকে পাঁচ হাজার, মিরাজ এয়ার ইন্টারন্যাশনালকে বিশ হাজার, জে স্কয়ার কনসালটেন্সিকে বিশ হাজার, রেঞ্জার ইন্টারন্যাশলকে বিশ হাজার ও নিউ জান্নাত ট্রাভেলসকে ত্রিশ হাজার এবং ট্রাভেলস কর্মচারী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পনের দিনের ও নজমুল ইসলাম খানকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ইরতিজা হাসান বলেন, লাইন্সেস-নিবন্ধনবিহীন ট্রাভেলসগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ইয়াহিয়া ওভারসীজের মালিক এনাম পলাতক: গত রবিবার থেকে ‘ইয়াহিয়া ওভারসীজ’ এজেন্সি তালাবদ্ধ। সাগরপথে জাহাজে করে ইউরোপ যেতে সিলেটের জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনের তৃতীয় তলার এই ‘ইয়াহিয়া ওভারসীজ’ নামের এজেন্সির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ভূ-মধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিহত তরুণরা। কথা ছিল জাহাজে করে নিরাপদে পৌঁছে দেবে ইতালি। কথা রাখেনি এজেন্সি মালিক। উল্টো লিবিয়ায় জিম্মি করে কয়েক দফা টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। স্বজনদের অভিযোগ ঘটনার পর এর মালিক এনাম আহমদ পালিয়ে গেছেন। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, তার সন্ধানে অভিযান চলছে।
ফেঞ্চুগঞ্জের নিহত আব্দুল আজিজের ভাই মফিজ আহমদ জানান, গত ৪ ডিসেম্বর ‘ইয়াহিয়া ওভারসীজ’র মাধ্যমে আজিজসহ তার ৩ আত্মীয়কে ইতালি পাঠানোর জন্য জনপ্রতি ৮ লাখ টাকা করে দেওয়ার চুক্তি হয়। কথা ছিল তাদের সরাসরি ফ্লাইটে পাঠানো হবে। কিন্তু তাদের ৩ দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়াতে নিয়ে রাখা হয় ৫ মাস। এই সময়ে ৩-৪ দিন পরপর তাদের খেতে দেওয়া হতো। ট্রাভেলসের মালিক এনাম আহমদের কাছে মানুষ ফেরত চাইলেও ওদের জিম্মি রেখে আরো ৩ লাখ টাকা করে বাড়তি আদায় করা হয়।
ফেঞ্চুগঞ্জের নিহত লিটন মিয়ার বাবা সিরাজ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, দালালচক্র প্রথমে তাদের নিয়ে যায় ভারতে। সেখানে কিছুদিন রেখে নিয়ে যায় শ্রীলঙ্কায়। এরপর শ্রীলঙ্কা থেকে লিবিয়া। এভাবে তাদের এখন থেকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার খবর কয়েকদিন ধরেই শুনছি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই অবস্থা হবে জানলে সন্তানকে বিদেশ পাঠাতাম না’। সিরাজ মিয়া বলেন, এনামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাচ্ছি না।
লিবিয়ায় জঙ্গলে মানবেতর জীবন : ফেঞ্চুগঞ্জের মুয়িদপুর গ্রামের বদরুল আলম জানান, ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারা তিনজন এবং নৌকাডুবি থেকে বেঁচে যাওয়া বিলাল আহমদকে নিয়ে লিবিয়ার ত্রিপলীর উদ্দেশে দালাল চক্র যাত্রা শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী তাকে অগ্রিম ৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। সেখানে পৌঁছার পর দেওয়া হয় আরো আড়াই লাখ টাকা। এছাড়া, ভালো জাহাজে পাঠানো ও ভালো খাবার দাবারের জন্য দেওয়া হয় আরো ৫০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
ইয়াহিয়া ট্রেভেলসের মেম্বারশিপ হয়নি : আটাব সিলেট চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, আটাবের মেম্বারশিপ পেতে প্রায় ৮ মাস আগে আবেদন করেছিল ইয়াহিয়া ট্রেভেলস। অবৈধ ব্যবসার প্রমাণ পাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানকে আটাব-এর মেম্বারশিপ দেওয়া হয়নি। রাজা ম্যানশন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাসুদ আহমদ জানান, দুই-আড়াই বছর ধরে রাজা ম্যানশনে ইয়াহিয়া ওভারসীজ নামে ব্যবসা করছেন এনাম আহমদ। ঘটনার পর থেকে এজেন্সি বন্ধ।
