অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে চলছিল অবৈধভাবে রক্ত ব্যবসা। রক্তদাতাদের কেউ কেউ মাদকসেবী। কয়েকজন জটিল রোগে আক্রান্ত। নেই রক্ত সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা। কোন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা না করেই সব ধরনের রক্তদাতার কাছ থেকে কেনা হতো রক্ত। তারপর সেই রক্ত বিক্রি করা হতো রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হলে শঙ্কটাপন্ন রোগীর স্বজনেরা শুধুমাত্র রক্তের গ্রুপ মিললেই কিনে নিত রক্ত। গতকাল বুধবার রাজধানীর লালমাটিয়ার একটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে হানা দিয়ে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখতে পায় অবৈধ রক্ত ব্যবসা।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে পরিচালিত ওই ভ্রাম্যমাণ আদালত দু’জন মাদকসেবীর কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করার সময় হাতেনাতে আটক করে ওই অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের মালিক ইব্রাহিম সবুজ ওরফে স্যালাইন সবুজকে। তিনি মানিক ও ফারুক নামে দুই মাদকসেবীর কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করছিলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত সবুজকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
দুই মাদকসেবী মানিক ও ফারুক জানায়, তারা প্রতি মাসে তিন থেকে চার বার রক্ত বিক্রি করে। প্রতি ব্যাগ রক্তের জন্য পান ২২০ টাকা করে। এই টাকা দিয়ে তারা মূলত নেশা করে।
সবুজ ভ্রাম্যমাণ আদালতকে জানান, তিনি শুধু রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। প্রতিব্যাগ রক্ত বিক্রি করা হয় ৫শ’ থেকে এক হাজার টাকায়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণির ডাক্তার এবং কর্মচারীরা রোগীদের জন্য এই রক্ত কিনে নিয়ে যায়। ওই ডাক্তার ও কর্মচারীকেও প্রতি ব্যাগ রক্তের জন্য কমিশন দিতে হয় একশ থেকে দুইশ টাকা। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ ব্যাগ রক্ত হতো এখান থেকে।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সবুজের অবৈধ ব্লাড ব্যাংকটি ছিল শংকরে। মাদকসেবীদের কাছ থেকে রক্ত নেয়ার দায়ে সেসময় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়। জামিনে বের হয়ে সবুজ লালমাটিয়ার এই অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া নিয়ে ফের শুরু করে অবৈধ রক্ত ব্যবসা।
সবুজ জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই পারিবারিক ব্যবসা করে আসছেন। তিনি পড়াশোনা করেননি। রক্তদাতাদের রক্তে সংক্রামক ব্যাধিসহ অন্য কোন রোগের জীবাণু আছে কিনা সেই পরীক্ষাও তিনি কখনো করতেন না।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ৭৩টি বৈধ বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই ঢাকায়। আর সারাদেশে অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা হাজারের ওপরে। উপজেলা পর্যায়েও গড়ে ওঠেছে এই ব্লাড ব্যাংক।
রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় (স্বাস্থ্য) পরিচালক ও সিভিল সার্জন এসব ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেন না। অভিযোগ আছে, এ জন্য তারা নিয়মিত পান উেকাচ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তাও এগুলো থেকে মোটা অংকের উেকাচ পেয়ে থাকে। রাজধানীতে কয়েকদিন পর পর ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালানোর কারণে অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের বাণিজ্য কমে আসছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের মতে মাদকসেবীদের রক্তে মরণব্যাধি এইডসের জীবাণু, হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস এবং বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু রয়েছে। জাতীয় এইডস কমিটি এর আগে পেশাদার ডোনারদের রক্ত পরীক্ষা করে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকার প্রমাণ পেয়েছে। এরপর থেকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও কয়েকটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় রক্তদান ও পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে রক্তদানে উত্সাহিত করতে দেশব্যাপী প্রচারাভিযান চালাচ্ছে।
