ডায়াবেটিস ও রোজা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৫
বিশ্বে এই মুহূর্তে ১.১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মুসলমান (যা বিশ্ব জনসংখ্যার ১৮-২৫ শতাংশ) বসবাস করে। এই জন সংখ্যার সবল ও সাবালক সদস্যগণের মাহে রমজানের রোজা রাখা আবশ্যক। বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের হিসাব মতে পৃথিবীর জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে ভোগে। ১৩ টি ইসলামী দেশে ১২,২৪৩ জন ডায়াবেটিক রোগীর উপর পরিচালিত ‘এপিডিমাইওলজি অব ডায়াবেটিস এন্ড রমজান’ (২০১১) শীর্ষক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ৪৩% টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগী এবং ৭৯% টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগী মাহে রমজানে রোজা রেখে থাকে। এই হিসাবে ৪০-৫০ মিলিয়ন মুসলমান ডায়াবেটিক রোগী রোজা রাখে। চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী রমজান মাসে ২৯-৩০ দিন রোজা পালিত হয়। ভৌগলিক ও ঋতুভেদে মোটামুটি ১৫-২০ ঘন্টা রোজা রাখতে হয়। সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ঔষধ সেবন সহ সকল প্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়- সূর্যাস্তের পরে অবশ্য আবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়া দাওয়া করা যায়। অর্থাত্ সূর্যাস্ত থেকে সুবেহ সাদেক পর্যন্ত সময়ে পানাহার এর সুযোগ আছে আর সুবেহ সাদেক থেকে সূযাস্ত পর্যন্ত কোন কিছু গ্রহণ করা চলেনা। মাহে রমজানে রোজা পালনের আবশ্যিক এ বিধান এ মাসে ’অসুস্থ’ আর ’মুসাফির’ দের জন্য শিথিল করে দিয়ে বলা হয়েছে ’অন্য সময়ে সে রোজা পুরণ করে নিতে হবে। আর এটিও যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে, তারা এর পরিবর্তে একজন মিস্কীনকে খাদ্যদান করবে।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়াম সাধনার এ সুযোগকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য ’সহজ করতে চান’, তিনি ‘কোন জটিলতা কামনা করেন না।’রোজা পালন একজন ব্যক্তির জন্য যাতে অনাবশ্যক অসুবিধাজনক না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআনে একজন অসুস্থ্য ব্যক্তিকে তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচর্যার স্বার্থে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা বা অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আবার এ দৃষ্টিতে একজন অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা বিধানার্থে পানাহার এর বিকল্প নয় এমন পর্যায়ের প্রতিষেধক গ্রহণেও সম্মতি রয়েছে। যেমন রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত পরীক্ষা করা এমনকি প্রয়োজন হলে ইনসুলিন ইনজেকশান নেয়া যেতে পারে। বিজ্ঞ আলেমবৃন্দ অভিমত দিয়েছেন এতে রোজার কোন ক্ষতি হয় না। চিকিত্সকের সাথে পরামর্শক্রমে ঔষধ সেবন এবং ইনসুলিন গ্রহণের সমযসীমা ও মাত্রা পুণ নির্ধারণ করিয়ে নিয়ে এবং অন্যান্য পরামর্শ সমন্বয় করিয়ে নিয়ে একজন ডায়াবেটিস রোগী অনায়াসে রোজা রাখতে পারেন। চিকি]সকের পরামর্শ ছাড়া য়ারা রোজা রাখেন তারা বেশ কিছু জটিলতার সন্মুখিন হতে পারেন। বিশেষ করে (১) রক্তে সুগারের স্বল্পতা বা হাইপোগা্লইসেমিয়া (২) রক্তে সুগারের আধিক্য বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া (৩) ডায়াবেটিস কিটো এসিডোসিস এবং (৪) পানিশুণ্যতা বা ডি হাইড্রেশনে ভুগতে পারেন। সাধারণত শুধু খাবার আর ব্যায়ামের মাধমে যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখেন তাদের রোজা রাখায় কোন সমস্যা বা ঝুকি নেই। যারা মেটফরমিন , গ্লিটাজোনস কিংবা ইনক্রিটিন জাতীয় ওষুধ গ্রহন করেন তাদের হাইপো হওয়ার ঝুকি অনেক কম । যারা ইনসুলিন কিংবা সালফোনাইল গ্রহণ করেন তাদের হাইপো হওয়ার ঝুকি কিছুটা হলেও থাকে। ঔষধ ও ইনসুলিন এর মাত্রা বাড়িয়ে কমিয়ে এই ঝুকি এড়ানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গিয়েছে ডায়াবেটিস রোগী রোজার আগের চাইতে রোজার সময় বরং ভাল বোধ করেন, রক্তের শর্করা ভাল নিয়ন্ন্ত্রনে রাখা সমভব হয়। শুধু প্রয়োজন পূর্ব প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন। রমজানে ডায়াবেটিক খাবার যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয় ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে—ইফতার : পানিশূন্যতা রোধ এবং শরীরে বিপাকক্রিয়ার জন্য শরবত একটি অপরিহার্য পানীয়। বিকল্প চিনি দিয়ে ইসবগুল, তোকমা, লেবু, কাঁচা আম বা তেতুল শরবত করে খাওয়া যেতে পারে। ডাব ছাড়া অন্যান্য মিষ্টি ফলের রস না খাওয়াই শ্রেয়। টক ও মিষ্টি উভয় ধরণের ফল দিয়ে সালাদ করে খেলে যেমন উপাদেয় হবে, তেমনি এতে খনিজ লবণ ও ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হবে। কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদাকুচি, টমেটোকুচি, পুদিনাপাতা ও লবণ মিশিয়ে খেলে বেশ সুস্বাদু হয়। কাঁচা ছোলা রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে এবং কোষ্টকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। সন্ধ্যারাত :ডায়াবেটিক রোগীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সন্ধ্যারাতের খাবার একেবারেই বাদ দেয়া উচিত নয়। সন্ধ্যারাতের খাবার, অন্যান্য সময়ের রাতের খাবারের সমপরিমাণ হবে। সন্ধ্যারাতে ভাত খাওয়া যাবে। তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ বরাদ্দ খাবারের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সন্ধ্যারাতে হালকা মসলায় রান্না করা যেকোন ছোট-বড় মাছ এবং সবজি থাকলে ভালো হয়। সাহারী:সাহারীতে রুটি, ভাত রুচি অনুযায়ী গ্রহণ করা যাবে। সাহারীতে খেতে হবে অন্যান্য দিনের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ। মাংসের পরিবর্তে ডিমও খাওয়া যেতে পারে। সাহারীতে দুধ খেলে ডাল খাওয়ার প্রয়োজন নেই। সতর্কতা ও পরিবর্তিত খাবার :যদি ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্য কোন জটিলতা, যেমন- কিডনির রোগ, উচ্চমাত্রার ইউরিক এসিড ইত্যাদি থাকে, তাহলে ডালের তৈরী খাবার কম খেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে মুড়ি, চিড়া এবং চালের গুড়া অথবা ময়দার তৈরী সিঙ্গারা বা সামুচা, আলুপুরি, আলুর চপ ইত্যাদি খাওয়া যাবে। অন্যান্য খাবার একই থাকবে। আলসার বা গ্যাসট্রাইটিসের সমস্যা থাকলে ডুবো তেলে ভাজা ও ঝালযুক্ত খাবারের পরিবর্তে চিড়া-মুড়ি খাওয়া যাবে। যেমন- ২টা পিয়াজু, ১টা বেগুনী, ১/২কাপ হালিমের পরিবর্তে ৫০ গ্রাম চিড়া ও ছোট ১ টি কলা ও আমিষের ঘাটতি পূরণের জন্য ১টি সিদ্ধ বা পোচ ডিম খাওয়া যাবে। রুচি অনুযায়ী ঝালছাড়া নরম খিচুড়ীি ১ কাপ খাওয়া যাবে। অন্যান্য খাবার একই থাকবে। যদি বেশী ওজনের সমস্যা থাকে, তাহলে যতটা সম্ভব কম থেকে হবে এবং খাবারে তেলের পরিমাণ কমাতে হবে। রোজা রেখে অনেকট হাটলে বা ভারী ব্যায়াম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিচে নেমে গিয়ে বিপদ হতে পারে। সাহারীতে কখনো না খেয়ে রোজা রাখবেন না। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে বিপদজনক অবস্থা হতে পারে। রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর ঔষধ এবং ইনসুলিনের ব্যবহার : যারা ঔষধ নেবেন তারা রমজানে অবশ্যই রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে ঔষধের ডোজ ঠিক করে নেবেন। যারা দিনে ১ বার ডায়াবেটিসের ঔষধ খান (যেমন- সালফোনাইলইউরিয়া দিনে ১ বার), তারা ইফতারের শুরুতে ঐ ঔষধ একটু কম করে খেতে পারেন। যারা দিনে একাধিক বার ডায়াবেটিসের ঔষধ খান (যেমন- সালফোনাইলইউরিয়া দিনে ২ বার), তারা সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সাহারীর আধা ঘন্টা আগে খেতে পারেন। যারা মেটফরমিন ৫০০/৮৫০ মি.গ্রা. দিনে ৩ বার গ্রহণ করেন, তারা ইফতারের পর মেটফরমিন ১০০০ মি. গ্রা. এবং সাহারীর পর ভরা পেটে ৫০০/৮৫০ মি. গ্রা. খেতে পারেন। যারা থায়াজলিডিনডিয়ন গ্রহণ করেন, তারা ঔষধটি একই মাত্রায় রাতের যে কোন সময়ে খেতে পারেন। যারা রিপাগ্লিনাইড অথবা নেটিগ্লিনাইড গ্রহণ করেন, তারা ইফতারের শুরুতে ও সাহারীর আগে থেকে পারেন অথবা সন্ধ্যা রাতে খাবার খেলে তার আগেও খেতে পারেন। ইনসুলিন :যে সকল রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাদের রমজানের পূর্বেই ইনসুলিনের ধরণ ও মাত্রা ঠিক করে নেয়া উচিত। যারা ৩ বার ইনসুলিন গ্রহণ করেন- তারা ইফতারের দুই ভাগ এবং সাহারীতে রাতের ১/২ ভাগ নেবেন। যারা ২ বার ইনসুলিন গ্রহণ করেন- তারা ইফতারের সকালের ডোজ এবং সাহারীতে রাতের ১/২ ভাগ নিবেন। যারা ১ বার ইনসুলিন গ্রহণ করেন- তারা ইফতারের সময় নিবেন। আধুনিক ইনসুলিন গ্রহণের মাধ্যমে রমজানে ডায়াবেটিক রোগীরা অধিক সুবিধা পেতে পারেন। লেখক :সরকারের সাবেক সচিব এবং এন বি আরের চেয়ারম্যান ও বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চীফ কো অর্ডিনেটর