গত ২ দিনের অমাবশ্যার অতি জোয়ারে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ও ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে ৪র্থ বারের মতো প্লাবিত হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৫০টি গ্রাম। প্লাবিত এলাকার ঘরবাড়ি ও স্থানীয় বাজারগুলোতে ওইসময় কোমর সমান পানি থাকে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে রান্না না করতে পেরে পবিত্র মাহে রমজানে সেহেরি ও ইফতারি না খেয়ে অনেকে রোজা রাখছেন। নামাজও আদায় করতে পারছে না অনেকে।
ঘরবাড়ি ৩ থেকে ৪ ফুট পানিতে ডুবে থাকায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ডুবে আছে মেঘনাপাড়ের অর্ধশতাধিক হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, ফসল। জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে কয়েক হাজার পুকুর ও ঘেরের মাছ। পানি ঠেকানো অন্ততঃ ৩০ কিমি. পাকা ও কাঁচা সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এদিকে প্লাবিত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরমে। সরকারি সহযোগিতা এখন পর্যন্ত পায়নি বলে দুর্গতরা জানায়। বোরহানউদ্দিনের বড় মানিকা, কুতুবা, পক্ষীয়া, টবগী, সাচড়া ও হাসাননগর ইউনিয়নসহ পৌর সভার ৫টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪৫ হাজার পরিবার সরকারি রাস্তা, উঁচু বাঁধ ও সাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গেলে প্লাবিতরা জানায়, বুধবার দুপুর ও রাতের জোয়ারে অন্যন্য দিনের চেয়ে বেশি উচ্চতায় পানি উঠে। মেঘনার পানি ঢুকে বড় মানিকা, কুতুবা, পক্ষিয়া, হাসাননগর, টবগী ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ ৫০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছে পরেছে। পৌরসভার ৪, ৫, ৬নং ওয়ার্ডের পানিবন্দি অনেকে ভোলা-চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কের উপর পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ির মতো ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। এসময় দেখা যায় রাস্তার উপর গর্ত করে অনেকে রান্না করছে। পক্ষিয়া ইউনিয়নের পলিটেকনিক কলেজের কৃষ্ণচূড়া সড়ক দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় চারদিকে পানি থই-থই করছে। এসময় দেখা যায়, কেউ বা ভেলা দিয়ে কিংবা কেউ কাঁধে করে সন্তান ও মালামাল উদ্ধার করে শুকনো জায়গার সন্ধানে ছুটছে। আব্দুল বারেক জানায়, খাদ্য ও বাসস্থানের সন্ধানে সপরিবারে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। পক্ষিয়া ইউনিয়নের গংগাপা আলম বাজার রেজিং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গবাদি পশুর সাথে অনেকটা মানুষের সহাবস্থান। দেড় মাসের ব্যবধানে রমজানের মধ্যে ৪র্থ বারের মতো ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। ১৫ দিন আগে জোয়ারের আঘাতে পক্ষিয়া ইউনিয়ন মিয়ারহাট এলাকায় প্রায় ১০০ শত মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্রথমে লোকালয়ে পানি ঢুকে। ওই ভাঙ্গাবাঁধ এখন ৪ গুণ এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। মঙ্গলবার তৃতীয়বারের মতো বড় মানিকা ইউনিয়নের ১০ গ্রাম, কুতুবা ইউনিয়নের ৮ গ্রাম, পক্ষিয়া ইউনিয়নের ১০ গ্রাম, হাসাননগরের ৬ গ্রাম, টবগী ইউনিয়নের ৩ গ্রাম, সাচড়া ইউনিয়নের ৫ গ্রাম, টবগী ইউনিয়নের ৪ গ্রাম প্লাবিত হয়। এসময় ওইসব গ্রামের প্রায় সকল মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। বড় মানিকার পীরগঞ্জ, রানিগঞ্জ, আলিমুদ্দিন বংলাবাজার এলাকা গিয়ে দেখা যায়, শত শত ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে থাকায় কম আয়ের মানুষরা রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছে। পানির নিচে ঘরবাড়ি তলিয়ে থাকায় সেহেরি ও ইফতার করতে পারছেন না অধিকাংশ পরিবার। প্লাবিত রহিমা বিবি জানায়, একটু কলের পানি দিয়ে ইস্তার করতে পারি না। পৌরসভার মাছ বিক্রেতা আলাউদ্দিন জানায়, সবকিছু পানিতে তলিয়ে দিয়েছে। উপায় না পেয়ে ডাইবেশন (ভোলা-চরফ্যাশন সড়ক) রোডে একটু আশ্রয় নিয়েছি। এদিকে বোরহানউদ্দিন বাজারের মাছ ওকাচা বাজার কয়েকদিন পানিতে প্লাবিত। ফলে ঈদকে সামনে রেখে ওই বাজারের ব্যবসায়ীদের বিকিকিনি বন্ধ। ফলে তারাও বিপদে আছেন।
কুতুবা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজমুলা আহসান যোবায়েদ, বড় মানিকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন বাবর জানান, তার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের সবকটিতেই জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যদের জন্য দ্রুত খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা দরকার। তিনি ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। যথাসময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কাজ শেষ না করায় এলাকাবাসীকে এই দুরাবস্থায় পড়তে হয়েছে এবং নির্মাণাধীনর বাঁধের ঠিকাদারদের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
বোরহানউদ্দিনের আলিমুদ্দিন-বাংলাবাজার থেকে দৌলতখানের সৈয়দপুর পর্যন্ত প্রায় ৩ কিমি. বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীনের পর সংস্কার বা পুঃনির্মাণ না করায় এবং পুরোনো বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি ঢুকে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ’র বরাত দিয়ে জানান, আপাতত ৫ লাখ টাকা ও ৬৫ টন চাল পাওয়া গেছে যার পরিমাণ আরও বাড়বে।
