প্রস্তাবিত আইনে যা আছে
০০ স্থানীয় সরকারে প্রভাব বিস্তার করা যাবে না
০০ ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় সুপারিশ করা যাবে না
০০ নিয়োগ পদোন্নতি বদলিতে সুবিধা পেতে সুপারিশ করা যাবে না
সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার অপ-ব্যবহার রোধ ও আচরণ নির্ধারণে উত্থাপিত একটি বিলের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি সংসদে উত্থাপিত হলেও সাড়ে তিন বছরেও বিলটি আলোর মুখ দেখেনি। বিলটি সম্পর্কে সংসদে প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়নি। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে। কারণ বর্তমান সংসদের মেয়াদ আগামী ২৫ জানুয়ারি শেষ হবে।
সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ‘সংসদ সদস্য আচরণ বিল-২০১০’ উত্থাপন করেন। বিলে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও আর্থিক বিষয়ে সদস্যরা কোন্ নীতি অনুসরণ করবেন—সে বিষয়েও এই বিলে নির্দেশনা রয়েছে। বিলটি উত্থাপনের পর তা বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংসদে কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার কথা। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরেও প্রতিবেদন আসেনি।
জানা গেছে, বিলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একজোট হয়েছেন। এ বিলটি সংসদে এলেও যেন পাস না হয় এজন্য তারা সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রচার চালাচ্ছেন। সরকারি দলের সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, ইকবালুর রহিম এবং বিএনপির সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়ার মতে, আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যপ্রণালী বিধিই যথেষ্ট। এ ধরনের আইনের প্রয়োজন নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবদুল মতিন খসরু ইত্তেফাককে বলেন, ‘কমিটি বিলটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের কোন আইন আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবকিছু দেখার পর বিলটি সম্পর্কে সংসদে প্রতিবেদন দেয়া হবে। এ কারণে আগামী অধিবেশনে বিলটি সম্পর্কে প্রতিবেদন দেয়ার সম্ভাবনা কম।’
এ সম্পর্কে বিল উত্থাপনকারী সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সংসদ ও সদস্যদের মর্যাদা রক্ষার্থে এ বিলটি আনা হয়েছে। আশা করি সদস্যরা বিলটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করবেন।’
বিলে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবিচল থেকে যাতে কাজ করতে পারেন সেই লক্ষ্যে এ বিল আনা হয়েছে। বিলে আচরণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে স্পিকারের নেতৃত্বে অনধিক নয় সদস্যের সমন্বয়ে একটি ‘নৈতিকতা কমিটি’ গঠন করার কথা বলা হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত হবে। কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করবে। কোনও আচরণ আইনবিরুদ্ধ হলে যে কেউ তা কমিটিকে জানাতে পারবে। গণমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগও আমলে নিতে পারবে এ কমিটি।
সাত মূলনীতি: বিলে বলা হয়েছে, সদস্যরা দায়িত্ব পালনকালে সাতটি মূলনীতি অনুসরণ করবেন। প্রথমত, সদস্যরা তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্পর্কিত থাকলে তা প্রকাশ করবেন; দ্বিতীয়ত, যেকোনো সিদ্ধান্ত ও কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ স্বচ্ছতা অবলম্বন করবেন এবং প্রয়োজনবোধে শুধু জনস্বার্থের ক্ষেত্রে তথ্যকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারবেন; তৃতীয়ত, সংসদ সদস্যরা তাঁদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করবেন এবং তারা যেকোনো যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকবেন; চতুর্থত, সদস্যরা তাঁদের নিজের, পরিবারের ও স্বজনদের কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা বস্তুগত সুবিধা লাভের জন্য কিছু করবেন না; পঞ্চমত, বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে এমন কোনও আর্থিক বা অন্য কোনও বাধ্যবাধকতায় সম্পৃক্ত হবেন না যা তার সংসদীয় দায়িত্ব পালনকে প্রভাবিত করতে পারে; ষষ্ঠত, দায়িত্ব পালনকালে সদস্যরা নিয়োগ, চুক্তি সম্পাদন, কাউকে পুরস্কার দেয়া, কোনও ধরনের সুবিধা দেয়ার সুপারিশসহ যেকোনো কাজে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেবেন এবং সপ্তমত, তাঁরা এই নীতিগুলোর প্রসার ঘটাবেন।
দায়িত্ব: সংসদের ভেতরে সদস্যরা কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কাজ করবেন। তাঁরা দায়বদ্ধতার সঙ্গে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন, আইন প্রণয়ন করবেন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। সার্বিকভাবে তাঁরা জাতীয় স্বার্থে কাজ করার পাশাপাশি আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। ব্যক্তিগত ও আর্থিক লাভের বিষয়টিকে বিবেচনায় না এনে তাঁরা বস্তুনিষ্ঠভাবে সংসদীয় ও সরকারি দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও আর্থিক তথ্য: বিলে বলা হয়েছে, সদস্যরা নিজের বা অন্যের স্বার্থে অবৈধ ও অসত্ পথ অবলম্বন করবেন না। তাঁদের নিজেদের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পদ এবং সম্পদের উত্স সম্পর্কিত তথ্য সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্যে প্রকাশ করবেন এবং প্রতি বছর তা নবায়ন করবেন। নৈতিকতা কমিটি যাচাই-বাছাই করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।
বিলে আরও বলা হয়েছে, তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে উপস্থাপন করতে পারবেন না। সরকারি, বেসরকারি খাতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, জ্যেষ্ঠতা বা অন্য কোনও সিদ্ধান্তে সুবিধা পেতে তাঁরা তাঁদের ক্ষমতা অপব্যবহার করে সুপারিশ করবেন না। সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সরকারি নীতি নির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করবেন না। স্থানীয় সরকারগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কোথাও অযথা প্রভাব বিস্তার করা যাবে না।
ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান: বিলে বলা হয়েছে, সদস্যরা আর্থিক প্রতিদান বা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে সংসদ বা কোনো কমিটিতে কোনো বিষয়, বিল উত্থাপন করবেন না। পাঁচ হাজার টাকার বেশি দামের কোনও উপঢৌকন বা সেবা গ্রহণ করলে তা নৈতিকতা কমিটিকে অবহিত করবেন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওই উপঢৌকন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবেন। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী গোপনীয় বিষয়ে কোনো তথ্য জানলে তিনি সেটা প্রকাশ করবেন না।
আইন লংঘনের শাস্তি: কোনো সদস্য এই আইন লংঘন করলে নৈতিকতা কমিটি তাদের বিবেচনা অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারবে। কমিটি গঠিত হওয়ার পর সংসদের মেয়াদ পর্যন্ত এর কার্যক্রম থাকবে। কমিটি প্রতি বছর সংসদে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে।
