মুদ্রা যোগান পরিমিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে গড় বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশে নামিয়ে আনতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য উত্পাদনশীল খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ যোগান নিশ্চিত করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে নির্বাচনী বছর হওয়াতে টাকা যোগান পরিমিত রাখা সম্ভব হবে না বলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনের কোনটাই সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করেছেন খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতনরাই। অন্যদিকে নতুন মুদ্রানীতির মাধ্যমে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবধরনের সহায়তা দেয়ার কথাও বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, গত কয়েক মাসে ঊর্ধ্বগামী মূল্যস্ফীতির চাপের সঙ্গে মজুরি বা ভাতা বৃদ্ধির চাপের সম্ভাবনা, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টির ঝুঁকি এবং প্রতিবেশী দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে সাত শতাংশের নিচে মূল্যস্ফীতি রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক গতিধারার বিশেষ করে পয়েন্ট টু পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী প্রবণতা না থাকায় সঞ্চিতি অনুপাতগুলো (সিআরআর ও এসএলআর) অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। আগামী ছয় মাসের এ মুদ্রানীতির ভঙ্গি আগের ছয় মাসের মুদ্রানীতির সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি এটি আগের মতই একটি ভারসাম্যমূলক মুদ্রানীতি ভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে বলে মনে করেন গভর্নর।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। মুদ্রানীতি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গভর্নরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র পরামর্শক আল্লাহ মালিক কাজেমী, ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাসান জামান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। নির্বাহী পরিচালক আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে অন্য ডেপুটি গভর্নরসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামনের দিনগুলো আর্থিক খাতের জন্য কঠিন হবে। কারণ নির্বাচনী বছর হওয়াতে একদিকে যেমন রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যাহত করবে উত্পাদন খাতকে, তেমনি নির্বাচন প্রচারণায় বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাবে। অন্যদিকে এ সময় ফটকা কারবারিও অনেকটা বেড়ে যায়। তাই দেশের মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য কঠিন হবে। বাজারে টাকার পরিমাণ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। আর মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান কমে যাবে। তখন মোট জাতীয় উত্পাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
নির্বাচনী আবহাওয়াতে মুদ্রা যোগান পরিমিত রাখা সম্ভব হবে কিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আল্লাহ মালিক কাজেমী বলেন, এ সময় মুদ্রা যোগান বাড়াব কিনা সেটা তো আমাদের হাতে। অবশ্য বিদেশ থেকে যে টাকা আসে সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বাজারে ঋণ কত যাবে, সরকার ঋণ কত নেবে সে বিষয়গুলো সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই এটা সম্ভব হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো কি কাজে ঋণ দিচ্ছে এবং কি কাজে লাগাচ্ছে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোযোগ অত্যন্ত বেশি। ফলে এক কাজে ঋণ নিয়ে অন্য কাজে খরচ করবে এমন সুযোগ খুব বেশি নেই। মুদ্রা যোগান অপরিমিত হবে না। এটা মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে না। এ সময় মুদ্রা যোগান পরিমিত করলেও এ টাকা যেন সঠিক খাতে যায় সেজন্য কৃষি ও এসএমই খাতকে প্রাধান্য দিচ্ছি। এছাড়া বড় ব্যবসায়ীদের যাতে সুবিধা হয় সেজন্য কম খরচে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা করা এবং রফতানিকারকদের জন্য ভর্তুকি সহায়তা করার বিষয়ে নজর দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গভর্নর বলেন, মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ সুষ্ঠুতর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতির ট্রান্সমিশন চ্যানেল বা প্রয়োগ পথগুলো সুগম করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি ঋণের সেকেন্ডারি বাজার কার্যক্রম জোরদার এবারের মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণসহ প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি বিশেষভাবে জোরদার করছে। এজন্য আধুনিক অনলাইন তথ্য-প্রযুক্তিও ব্যবহারে আনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকসহ বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করা হয়েছে। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির আগে তাদের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিকে সুস্পষ্ট অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে গভর্নর মনে করেন।
পুঁজিবাজার বিষয়ে
গভর্নর বলেন, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থনও আগের মতই অব্যাহত থাকবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ লক্ষ্যে নতুন পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। পদক্ষেপ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এস কে সুর চৌধুরী বলেন, মুদ্রানীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে পুঁজিবাজারের জন্য সহায়ক সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি। যেমন গত বছর আমরা পুঁজিবাজারে তারল্য সহায়তা উত্সাহিত করায় বর্তমানে তারল্য কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণের জন্য প্রণোদনা স্কিম বাস্তবায়নের জন্য আমরাই উদ্যোগী হয়েছি। এজন্য অতিসম্প্রতি ৯০০ কোটি টাকার ফান্ড করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
লক্ষ্যমাত্রার পরিসংখ্যান
মুদ্রানীতিতে রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হার ধরা হয়েছে সাড়ে ১৫ শতাংশ। আর ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক দুই শতাংশ। মুদ্রানীতি প্রোগ্রামে বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের ঊর্ধ্বসীমা ২০১৩-এর মধ্যে সাড়ে ১৫ শতাংশ এবং ২০১৪-এর জুনে সাড়ে ১৬ শতাংশ হবে। যা জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও উদীয়মান এশিয়ান অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ দশমিক তিন শতাংশ এবং আগামী জুন পর্যন্ত এ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক দুই শতাংশ। সরকারি ঋণে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ধরা হয়েছে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জুন নাগাদ ১৯ দশমিক পাঁচ শতাংশ।
