বেসরকারি খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও এটিকে চাঙ্গা করতে কোন পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেই। বিদ্যুত্, গ্যাস এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অভাবে খাতটি ঝিমিয়ে পড়েছে আগেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সমপ্রতি যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে তাতে বেসরকারি খাতকে আবারো নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়ে থাকা বিপুল অলস অর্থ বিনিয়োগের ধারায় নিয়ে আসতে নতুন মুদ্রানীতিতে পদক্ষেপ থাকার আশা করা হলেও বাস্তবে এর উল্টোটা ঘটেছে।
এর আগের মুদ্রানীতিতে মোট ঋণের ১৮ শতাংশ বেসরকারি খাতের জন্য রাখা হলেও এবার তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে রাখা হয়েছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, কেন্দ ীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা ধরেই নিয়েছেন সামনের দিনগুলোতে বিনিয়োগে বন্ধ্যাত্ব থাকবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আগেভাগেই এ খাতে ঋণের লাগাম টেনে ধরেছে।
সামপ্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঋণের সুদে উচ্চহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এজন্য বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় জমে আছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমিয়ে এনেছে। কিন্তু ঋণের সুদের হার কমায়নি।
এ বিষয়ে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর সভাপতি এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘যারা সত্যিকারের বিনিয়োগকারী তারা নতুন মুদ্রানীতির কারণে সমস্যায় পড়বেন।’ নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে সবাই এখন একটু বেশি যাচাই বাচাই করছে। আর নির্বাচনী বছরে এমনিতেই ঋণের প্রবৃদ্ধি কম থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে তিনি জানান। বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি কমে যাবার কারণে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমানো হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল আমিন বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। নির্বাচনী বছরে পরিস্থিতি কি হয় তা একটু দেখে নিতে চাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে, নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের শিল্পায়নের ধারা পর্যালোচনায় এনেছে বলে জানা গেছে। কেন্দ ীয় ব্যাংক মনে করেছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হলে সেটির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত নাও হতে পারে। তাই এ খাতে ঋণের যোগান কম রাখা হয়েছে। কেন্দ ীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা তাদের শিল্পস্থাপনের জন্য যে মুলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করেন তাতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ আরো কমে যাবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কেন্দ ীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে-এই ১১ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে তিন হাজার ২৪২ কোটি মার্কিন ডলারের। অপরদিকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে দুই হাজার ৯৪৮ কোটি মার্কিন ডলারের। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে লাগাম টেনে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ ইত্তেফাককে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এমনিতেই অনেক কমে আসছে। গত মুদ্রানীতিতে মোট ঋণের সাড়ে ১৮ শতাংশ বেসরকারি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিলো। এর থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ১০ শতাংশের মতো। এবার তা আরো কমানো হয়েছে।
তিনি বলেন, মূলত: রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেকে এসময়ে বিনিয়োগে উত্সাহিত হচ্ছেন না। বিদ্যুত্, গ্যাস এবং অন্যান্য অবকাঠামো সমস্যাতো আছেই। যেসব কারখানা উত্পাদনে আছে সেগুলোতে ঠিকমতো গ্যাস এবং বিদ্যুত্ সরবরাহ নেই। নতুন কারখানা স্থাপনের সময়ও বিদ্যুত্ এবং গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। এটি বিনিয়োগকারীদের নিরুত্সাহিত করছে। এতকিছুর পরও ঋণের সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নিলে বিনিয়োগকারীরা উত্সাহ পেতেন।
বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি এ বিষয়ে বলেন, এমনিতেই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম। এবার তা আরো কমানোর ফলে দেশে শিল্পায়ন ব্যাহত হবে। যার চাপ গিয়ে পড়বে কর্মসংস্থানের ওপর। তিনি বলেন, মুদ্রানীতিতে ঋণপ্রবাহ কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যাচাই বাচাই করবে। উদ্যোক্তাদের হয়রানি বাড়বে। তার মতে, অলস অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারতো। বিশেষ করে সুদের হার কমানোসহ ঋণপ্রদান প্রক্রিয়া সহজ করতে পারলেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উত্সাহ ফিরে আসবে।
এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবার কারণে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে। এজন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও মুদ্রানীতিতে তা কমিয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে।
