অনিয়মই যেখানে নিয়ম

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৭
জনবল নিয়োগ দিতে গিয়ে নিয়ম ভেঙেছে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। যোগ্যতা বিবেচনায় না নিয়ে পছন্দের লোক নিয়োগ দিয়ে দল ভারী করার কাজে প্রশাসন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিয়োগ: নিয়োগ নীতিমালা উপেক্ষা করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। সম্প্রতি ১৫২ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকরা। তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত ২৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ৬০তম সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। অথচ সিন্ডিকেট সভার আগেই ইউজিসি চিঠির মাধ্যমে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইউজিসি চিঠিতে জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য সরকার থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তাই আপনার (রেজিস্ট্রার) বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরে অতিরিক্ত কোন অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও সরকারের কাছ থেকে কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আপনার প্রতিষ্ঠানে বাজেট ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে এত বেশি জনবল নিয়োগ দেয়া হলে বাজেট ঘাটতি আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ইউজিসির এ নিষেধাজ্ঞা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শোনা তো দূরের কথা, নতুন করে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে। বাজেট ঘাটতি থাকার পরও জনবল নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী নীল দলের একাধিক শিক্ষক এবং বিএনপিপন্থী সাদা দলের শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক শিক্ষক জানান, এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট ঘাটতি তারপর আবার অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ বছর অতিরিক্ত লোকের বাজেট ইউজিসি দেয়নি। তাহলে অতিরিক্ত লোকের বেতন কোথা থেকে আসবে, তারা এমন প্রশ্ন রেখেছেন প্রশাসনের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ট্রেজারার অধ্যাপক হযরত দাবি করেন, ‘ইউজিসির নিকট থেকে অনুমোদন নিয়ে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ এখন বাজেটের ঘাটতি দেখিয়ে ইউজিসি বিতর্কিত চিঠি দিয়েছে।’ তিনি বাজেট ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির অনুমোদন না নিয়েও জনবল নিয়োগ দেয়।’ আরোপিত নীতিমালাও মানছে না: শেকৃবিতে কোন নিজস্ব নিয়োগ নীতিমালা নেই। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউজিসি এর নিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ করার নির্দেশ দেয় সরকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ম না মেনে জনবল নিয়োগ দিয়ে চলেছে। অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালায় মেধাক্রম অনুযায়ী ১ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের আইন থাকলেও এটিকে আমলে নেয়নি প্রশাসন। বর্তমান উপাচার্যের সময় ১৫২ জন জনবল নিয়োগের মধ্যে প্রভাষক নিয়োগ পেয়েছেন ৩৮ জন। এদের মধ্যে এগ্রিকালচারাল বোটানীতে মাস্টার্স করে কৃষি রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তার মেধাক্রম ৫৯। এছাড়া মেধাক্রম অনুযায়ী ২৪তম অবস্থানে থেকে কীটতত্ত্বে, ৪১তম অবস্থানে থেকে কৃষিতত্ত্বে, ৫২তম অবস্থানে থেকে উদ্যানতত্ত্বে, ৩১ তম মেধাস্থান এগ্রিকালচারাল বোটানীতে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শিক্ষক বলেছেন, ছাত্রলীগ সমর্থিতদের নিয়োগ দিতে গিয়ে নিয়ম মানা হচ্ছে না। এ বিষয়ে ট্রেজারার অধ্যাপক হযরত আলী বলেন, ‘একটি সিন্ডিকেট সভায় ৭ শতাংশ নীতিমালার বিষয়টি বাতিল করা হয়েছে। এই নিয়ম থাকলে সব বিভাগে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যায় না।’ নিয়োগ প্রক্রিয়া শিথিল!: বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০তম সিন্ডিকেটে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো শিথিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০০৯ সালের ২ জুনের প্রজ্ঞাপনটি পাস করা হয়েছে। এ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রার্থীর এসএসসি এবং এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৩ থাকলেই শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ইউজিসি এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী জিপিএ ন্যূনতম ৩ দশমিক ৫ থাকা দরকার। বিশেষ কাউকে নিয়োগ দেয়ার জন্য যোগ্যতা কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক কর্মকর্তা। মেধাবী শিক্ষার্থীর মামলা: মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং জেনেটিক্স বিভাগে মাস্টার্স করা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পরও নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এমএম উজ্জ্বল আহমেদ লিটন। নিয়োগ নীতিমালা না মেনে আবারও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে চাইলে তা প্রকাশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন তিনি। রিটকারী উজ্জ্বল বলেন, ‘আমি ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষক প্রার্থী হয়ে আবেদন করে আসছি। সর্বোচ্চ ফলাফল থাকা ছাড়াও আমার মুক্তিযোদ্ধা কোটা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০ শতাংশ নিয়োগের বিধান থাকলেও আমাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি।’ এসব বিষয়ে কথা বললে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা মো: আব্দুল লতিফ বলেন, নীতিমালা শিথিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে পাস হওয়া সম্পূর্ণ আইন পরিপন্থী। এজন্য সাদা দলের পক্ষ থেকে বার বার লিখিত অভিযোগ দেয়ার পরও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। এভাবে শিক্ষক নিয়োগ পেলে ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। উজ্জলের ব্যাপারে ট্রজারার অধ্যাপক হযরত আলী দাবি করেন, কীটতত্ত্ব বিভাগে তার চেয়ে বেশি জিপিএ পাওয়াদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।