নয়া দিল্লিতে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দীপু মনির সাক্ষাত্

বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার চায় ভারত

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৫২
ভারত এমন কোন প্রকল্প হাতে নেবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় :মনমোহন সিং তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি না এগোলে আগামী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে :দীপু মনি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ দুই দেশের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার প্রত্যাশা করে তার দেশ। যাতে দুই দেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকে। গতকাল শুক্রবার ভারত সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গেলে মনমোহন সিং এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ বিষয়ে দীপু মনি বাসসকে জানান, ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এদিকে নয়াদিল্লিতে দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের পার্লামেন্টে বিলটি যদি পাস না হয় এবং এর ফলে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি যদি না এগোয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। জনগণ যখন ভোট দেবে তখন তারা এ বিষয়গুলো অবশ্যই মনে রাখবে। গতকাল সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন দীপু মনি। সন্ধ্যায় তিনি বিজেপির রাজ্যসভার নেতা অরুণ জেটলিসহ দুই নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন এবং রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের দেয়া এক নৈশভোজ সভায় অংশ নেন বলে ঢাকায় পাওয়া খবরে জানা যায়। মূলত এই সফরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালে সই হওয়া এ সংক্রান্ত প্রটোকল বাস্তবায়ন করতে বিজেপির সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসাবে তিনি অরুণ জেটলির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্: গতকাল সকালে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে দীপু মনি বাসসকে বলেন, ভারত সবসময় বাংলাদেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নিরাপত্তার জন্যে বাংলাদেশ যে ব্যবস্থা নিয়েছে ভারত তা সবসময়ই গুরুত্ব সহকারে দেখে বলে মনমোহন সিং জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রয়াসের কারণেই এ অঞ্চলে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তারা প্রত্যাশা করেন, বাংলাদেশে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার থাকবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক বজায় থাকবে। আলোচনাকালে তারা দুই দেশের সরকারের মধ্যে নেয়া প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দুই দেশের মধ্যে পাওয়ার গ্রিড সংযোগ কাজ এগিয়ে চলছে। সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিডে বিদ্যুত্ সঞ্চালন শুরু হবে। এছাড়া জলবিদ্যুত্ কেন্দ গুলোর কাজও এগিয়ে চলেছে। টিপাইমুখের যৌথ সমীক্ষা শেষ হয়েছে। সেখানে ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে পাওয়ার প্ল¬ান্ট নির্মাণ করে দুই দেশই লাভবান হবে। আগরতলা-আখাউড়া রেললাইন সংযোগের কাজ এগিয়ে যাওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন বলে দীপু মনি জানান। তিনি জানান, মনমোহন সিং বলেছেন, ভারত এমন কোন প্রকল্প গ্রহণ করবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা পারস্পরিক স্বার্থ-সংশি¬ষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে দীপু মনি জানান, বিজেপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সন্তুষ্ট। বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি জানিয়েছেন, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এবং তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে তার দলের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারবেন। দীপু মনিও বলেছেন, বিজেপির বিষয়ে তিনি আশাবাদী। তবে বিরোধিতার অবস্থান থেকে বিজেপি সরে এসেছে-এ কথা তারা বলেননি। চুক্তির ব্যর্থতা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে: এদিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অস্বস্তির বিষয়টি নয়াদিল্লিতে দীপু মনির কথায় প্রকাশ পেয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ ও ভারতের রাজ্যসভায় বিরোধী দলীয় নেতা বিজেপির অরুণ জেটলির সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে দিল্লিতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি যদি না এগোয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত, অনেকদিন ধরে ঝুলে থাকা এই চুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্ব সব দলই বুঝতে পারবে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন বিল পাসের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালে সই হওয়া এ সংক্রান্ত প্রটোকল বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এ লক্ষ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকার এর আগে পার্লামেন্টে বিল তোলার উদ্যোগ নিলেও বিষয়টি আটকে আছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির বিরোধিতার কারণে। কারণ কোনো বিল পাস করতে হলে ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয়কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন দরকার। যা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের নেই। স্থল সীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট সাত হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময়ের কথা রয়েছে, যা নিয়ে বিজেপির আপত্তি। দলটি বলছে, ছিটমহল বিনিময় হলে যে পরিমাণ জমি হাতবদল হবে, তাতে ভারত প্রায় ৭ হাজার একর বেশি জমি হারাবে। নির্বাচনের ছয় মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে এই অমীমাংসিত বিষয়টি নিয়ে বিজেপির সঙ্গে আলোচনা করতেই দিল্লি গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামী ৫ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া রাজ্যসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে আবারো বিলটি তুলবে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দল কংগ্রেস। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের যে সফরে ঢাকায় স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়, ওই সময়ই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা ছিল দুই দেশের মধ্যে। সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হলেও শেষ মুহূর্তে চুক্তি আটকে যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে। এর আগে বৃহস্পতিবার দিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনে দেয়া বক্তৃতার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে দীপু মনি বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে দুই সরকারের মধ্যে মতৈক্য আছে। আর সীমান্ত চুক্তির বিষয়টি সুরাহার জন্য ভারতের বিরোধী দল বিজেপির সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করি। এ সময় তিনি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে কথা বলেন।