সেনা অভিযানে বি টেকনোলজির ৫ কর্মী উদ্ধার

১৮ দিন পর মুক্ত জীবনে ওরা

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৩
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টানা অভিযানে শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের কারিগরি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান বি টেকনোলজির অপহূত ৫ কর্মীকে ছেড়ে দিয়েছে অপহরণকারীরা। টানা ১৮ দিন অপহূত থাকার পর মুক্ত জীবনে ফিরে এসেছেন তারা ৫ জন। উদ্ধার পাওয়ার পর রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। অপহূত প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। এটা সত্যি অভাবনীয়। এখন বাবা-মাসহ পরিবারের সবার সঙ্গে রোজা রেখে ঈদ করতে পারব। এজন্য খোদাতাআলার প্রতি অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ যারা আমাদের মুক্তির ব্যাপারে সবসময় চেষ্টা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ গত ৮ জুলাই রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির বারিবিন্দুঘাট এলাকা থেকে আক্তার হোসেনসহ বি টেকনোলজির চারজন এবং সেখানে থাকা আরেকজনকে অপহরণ করে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। অপহূত অন্য চারজন হলেন প্রতিষ্ঠানটির টেকনিশিয়ান ইমরুল হোসেন ও হেমায়েত হোসেন এবং অনিয়মিত টেকনিশিয়ান সুজাউদ্দিন ও তার সঙ্গী খাগড়াছড়ি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মুজিবুর রহমান। গতকাল শুক্রবার ভোর চারটা থেকে সাড়ে চারটার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার সীমান্তবর্তী মেরুং এলাকার জঙ্গলাকীর্ণ একটি টিলা থেকে তাদের উদ্ধার করে। সেখান থেকে খাগড়াছড়ি হয়ে তাদের প্রথমে রাঙ্গামাটি শহরের ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে এবং পরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা। উদ্ধার হওয়া মুজিবুর রহমান বলেন, ‘অনিয়মিত টেকনিশিয়ান সুজাউদ্দিনসহ আমরা খাগড়াছড়িতে একসঙ্গে থাকি। তার সঙ্গে গিয়েছিলাম বাঘাইছড়ি। তারপর আমাদের এই বিপদ। কখনো মনে হতো এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব, আবার মনে হতো পাব না। জীবনটা ছিল একদম দোদুল্যমান। অবশেষে আপনাদের সবার দোয়ায় ফিরে এলাম।’ টেকনিশিয়ান হেমায়েত হোসেন বলেন, ‘অপহরণের দুই কি তিনদিন পর একটি বিষয়ে তর্ক করতে গিয়ে আমাকে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় মেরেছে। এছাড়া আর কোন শারীরিক নির্যাতন করেনি। তবে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত ছিলাম। সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে থেকেছি। পরিবারের লোকজন, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার কথা মনে পড়ত। ভাবতাম, আর দেখা হবে কিনা। এখন খুব ভালো লাগছে।’ উদ্ধার অভিযান বিষয়ে রাঙ্গামাটি ডিজিএফআই-এর অধিনায়ক মেজর তাজুল ইসলাম জানান, অপহূতদের উদ্ধার করতে কোন মুক্তিপণ দিতে হয়নি। তিনি বলেন, উদ্ধারে অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর পাশাপাশি ডিজিএফআইও তত্পর ছিল। গত রাতে (বৃহস্পতিবার) তৃতীয় দফা অভিযানে তাদের সফলতা আসে। অপহরণকারীরা প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অপহূতদের স্থানান্তর করছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে দীঘিনালার মেরুংয়ের একটি পাহাড়ি এলাকায় গোয়েন্দা বাহিনী ওত পেতে থাকে। মধ্যরাতে তাদের স্থানান্তর করতে গিয়ে অপহরণকারীরা গোয়েন্দা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। এ সময় অপহরণকারীরা অপহূতদের পাহাড়ে ফেলে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। কোনরকম গুলিবর্ষণ ছাড়াই গোয়েন্দা বাহিনী অপহূতদের পাহাড়ের চূড়া থেকে উদ্ধার করে সকালে রাঙ্গামাটি নিয়ে আসে। রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার আমেনা বেগম জানান, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন কৌশলের কারণে অপহরণকারীরা চাপের মুখে পড়ে। প্রযুক্তিগত সহায়তায় অপহরণকারীদের সম্পর্কে অনেক তথ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চলে আসে। ফলে অভিযানে অপহূতদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টার কারণে কোন ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই অপহূতদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, টেলিটক কর্তৃপক্ষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞ। অপহূত পাঁচজন জানান, অপহরণের প্রথম তিনদিন তাদের রাখা হয়েছিল পাশাপাশি দু’টি বাড়িতে। এরপর যখন উদ্ধার অভিযান শুরু হয়, তাদের কখনো দিনে, কখনো বা রাতে স্থানান্তর করা হতো। রাতে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় অথবা ঘন বনজঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের ঢালুতে রাখা হতো। ঘুমানোর জন্য প্লাস্টিকের ত্রিপল বিছিয়ে দেয়া হতো। দিনে স্থানান্তরের সময় চোখ বেঁধে দেয়া হলেও রাতে তা করা হতো না। ৩/৪ দিনে মাত্র একবার গোসল করতে দেয়া হতো পাহাড়ি ঝরনা অথবা ছড়ায়। গোসলের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র একটি লুঙ্গি। এ ক’দিন কি খেয়েছেন তারা এমন প্রশ্নের জবাবে অপহূতরা জানান, তাদের প্রতিদিন দুই বেলা খাবার দেয়া হয়েছে। অপহরণের পর থেকে মাত্র একবার মুরগির মাংস খেতে দেয়া হয়েছিল। প্রথমদিন খাওয়ানো হয়েছিল বাঁশ ও কোঁড়ল। কিন্তু তারা বাঁশ ও কোঁড়ল খেতে না পারায় তাদের জন্য ডালের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে-মধ্যে সবজি খেতে দিত। প্রতিদিন জুম ধানের ভাত খেতে দিয়েছে।