মোটামুটি সারা বছরই রাজধানী ও হাইওয়েতে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, তবে ঈদের আগে সেটা চরম আকার ধারণ করে। ঈদের আগে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে যানজট থাকবে না-এটা বোধ হয় শুধুমাত্র চলচ্চিত্রেই সম্ভব। ঈদ এলে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু থেকে অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে যায় যানজট। একই অবস্থা হয় মহাসড়কগুলোতেও। ঈদের ছুটি কাটাতে সড়কপথে গ্রামের বাড়ি যেতে তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে হয় ১২ থেকে ১৫ ঘন্টায়, কখনো কখনো আরো বেশি। এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে নিয়েছে মানুষজন।
কেন এই অবস্থা? এ জন্য পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব যাদের উপর সেই ট্রাফিক বিভাগের মতে, সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে। মোটামুটি রাজধানীর সড়কের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি। চালকদের আইন মেনে না চলার প্রবণতাকেও যানজটের কারণ হিসেবে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে এর পাল্টা বক্তব্যও পাওয়া গেছে। অনেকেই বলছেন, ট্রাফিক বিভাগের অদক্ষতা ও হাইওয়েতে পুলিশের চাঁদাবাজির কারণে যান চলাচলে এই বিশৃঙ্খলা।
তবে সাধারণ চোখে যানজট ও যানচলাচলে বিশৃঙ্খলার জন্য এই দুটি বিষয়কেই প্রধান কারণ বলে মনে হতে পারে। এর পাশাপাশি আরো বেশকিছু বিষয় আছে, যা মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
চালকদের আইন না মানার প্রবণতা রাজধানীসহ মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, সৃষ্টি হয় যানজট। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, যেখানে সেখানে গাড়ি ঘোরানোর কারণে সড়ক ও মহাসড়কে বাঁধে যানজট। সড়কে নিজের গাড়ি যাবে সবার আগে, চালকদের এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতাও যানজটের অন্যতম কারণ। অথচ একটু ছাড় দিলেই সব গাড়ি নির্বিঘ্নে যেতে পারে গন্তব্যে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানজটের এটা অন্যতম কারণ।
বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের গাড়ি অনেক ক্ষেত্রে সবার জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য তা মেনে চলে না। এমনও হয়েছে ব্যস্ততম সড়কে সাধারণ যান চলাচল আটকে কিংবা অন্য গাড়ির গতি মন্থর করে যেতে দেখা যায় তাদের গাড়ি। রাজধানীর কোন কোন সড়কে উল্টো পথেও চলে এসব গাড়ি।
রাজধানীতে অল্প দূরত্বে গড়ে উঠেছে একাধিক শপিং মল। বহুতল ভবনের দাপটে তো আকাশই দেখা যায় না। ওই সব বহুতল ভবন ও শপিং মলে নেই প্রয়োজনীয় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ঈদ এলে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে কেনাকাটা করতে যাওয়া নগরবাসীর ব্যক্তিগত গাড়িটি অনেক সময়ই মার্কেটের নির্দিষ্ট গাড়ি রাখার স্থানে না রেখে মার্কেটের সামনের রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। রমজান মাসে প্রায় সব কয়টি মার্কেটের সামনের সড়কের অর্ধেক অংশ জুড়ে দেখা যায় কয়েকশ গাড়ি যত্রতত্র পার্কিং করা।
রমজান মাসে ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কেও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমে যায় যান চলাচলের রাস্তা। এগুলো দেখার যাদের দায়িত্ব, সেই সিটি করপোরেশন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নেই প্রয়োজনীয় তত্পরতা।
হাইওয়েতে যানজট সৃষ্টির কারণ ও এর প্রতিকারের ব্যাপারে জানতে যখনই হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বরাবরাই তারা একই ধরনের কথা বলে- হাইওয়ে পুলিশের জনবল সীমিত, এত বড় মহাসড়কে টহল দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই।
জানা গেছে, মহাসড়কে চালকদের বেখেয়ালিপনা, মহাসড়কে গাড়ি রেখে যাত্রী ওঠানো-নামানোর চেষ্টা, ঈদকে সামনে রেখে পুরনো গাড়ি মহাসড়কে নামানো এবং সেগুলো যেখানে-সেখানে নষ্ট হওয়ার কারণেও বাঁধে যানজট।
বর্ষা মৌসুমে প্রায়া সড়ক-মহাসড়কে সৃষ্টি হয় খানাখন্দ, বড় বড় গর্ত। এ কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়, চলে মন্থর গতিতে। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। আবার এ সময় সড়ক সংস্কারের নামে মহাসড়কের অনেক পয়েন্ট বন্ধ করে রাখা হয়। এ কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মহাসড়কে একশ’ থেকে দেড়শ’ কিলোমিটারব্যাপী যানজটেরও নজির তৈরি হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হাইওয়েতে যানজট নিরসন, মহাসড়কে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য হাইওয়ে পুলিশ গঠন করা হলেও বিভাগটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। হাইওয়ে পুলিশের জনবল সীমিত, মামলা রুজু ও তদন্ত করার ক্ষমতা। যার কারণে অনেক সময়ই চালক অপরাধ করলেও ব্যবস্থা নেয়া যায় না। আর হাইওয়ে পুলিশের এই দুর্বলতার বিষয়টি জেনে চালকরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম থেকে কাঁচপুর আসতে যতক্ষণ লাগে তারচেয়েও বেশি সময় লাগে ডেমরার মুক্তি সরণি থেকে সায়েদাবাবাদ পৌঁছতে। ঢাকা থেকে বেরুতে যাত্রাবাড়ী মোড় পেরুতেই লাগে কয়েক ঘণ্টা। মূলত ফ্লাইওভার নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সেখানে সারা বছরই লেগে থাকে মহাযানজট। আর ঈদ এলে তো কথাই নেই।
গত বৃহস্পতিবার রাতে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ফ্লাইওভারে গার্ডার উত্তোলনের কথা বলে নির্মাণ কর্তৃপক্ষ হঠাত্ সড়কের একদিকে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সায়দাবাদ থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। সারা রাত আপ্রাণ চেষ্টা করে পরদিন সকালে যানজট কিছুটা স্বাভাবিক করে ট্রাফিক বিভাগ। আরো ১০ দিন এমন অবস্থা থাকবে বলে নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগকে।
নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষের ফ্লাইওভারের নীচ দিয়ে যানবাহন চলাচলের উপযোগী পথ করে দেয়ার কথা থাকলেও তারা সড়কের এমন হাল করেছে যে সেখানে দুর্ঘটনা বেড়েছে, যানজট বেড়েছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক পূর্ব) ইকবাল হোসাইন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রাবাড়ী এলাকা যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ মুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মহানগর পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে যানজট সৃষ্টির পেছনে সাধারণ চালকরা একাই দায়ী নন। অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি, কর্মকর্তাও সমানভাবে দায়ী। তারাই বেশি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করছেন।
মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ বলেন, রাজধানীর যানজটের জন্য ২৩২টি কারণ বলা যায়। তবে যানজটের প্রধান কারণ বলা যায় চালকদের ট্রাফিক আইন না মানার মানিসকতা। এ মানসিকতা পরিবর্তন করলে ও বহুতল ভবন এবং শপিংমলে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা কমে যাবে। সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে যানজট।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, বিলাসবহুল বাস, বাস সাধারণ বাসগুলোর চালকরা হাইওয়েতে কোন আইনই মানেন না। সামান্য যানজট দেখলে তারা উল্টো পথে সামনে এগুনোর চেষ্টা করেন। একজন চালকের দেখাদেখী অন্য চালকরাও তখন তাকে অনুসরণ করে। সৃষ্টি হয় বড় ধরনের যানজট।
হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে হাইওয়ে থানা মাত্র ২৮টি ও ফাঁড়ি ৪৪টি। আর জনবল মাত্র ২২০০ জন। এই জনবল দিয়ে সারাদেশে হাইওয়ের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ রাখা অসম্ভব। একটি হাইওয়ে থানা থেকে অপর থানার দূরত্ব ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। রাস্তায় হঠাত্ গাড়ি বিকল হলে রেকার ঘটনাস্থলে আসতে আসতেই ৭০/৮০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট বেঁধে যায়। এছাড়া হাইওয়ে পুলিশের মামলা ও তদন্ত করার ক্ষমতা নেই। মামলা করে জেলা পুলিশ। তা নিয়ে প্রায়ই হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
পুলিশের ডিআইজি (হাইওয়ে) আসাদুজ্জামান বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত হাইওয়ের যানবাহনসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। রাতে টহল ও রাস্তার পাশে অবৈধ স্থাপনা সরানোর কাজ করতে হয় হাইওয়ে পুলিশকে। হাইওয়ে পুলিশকে মামলা রুজু ও তদন্তের ক্ষমতা এবং জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ঈদে যাতে ঘরমুখো মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি যেতে পারে সেজন্য পুলিশের সমন্বয়ে নেয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। ফেরিঘাটে যান চলাচলে বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখতে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ঈদ সামনে রেখে অফিস ছুটির পর এবং মার্কেট কেন্দ্রিক যানজট হচ্ছে। ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গের মানসিকতা কাজ করছে একশ্রেণীর লোকের। এত কিছুর মধ্যে ঈদকে সামনে রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মানুষ সুন্দরভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে যাতে বাড়িতে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের জনবল বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
