অতশী টেক্সট মেসেজ করেছে পলিকে, জানিস, তোর জন্য একটা কবিতার বই কিনেছি, ঈদ উপহার! পলির মন ভরে যায়। সে মুক্ত আকাশে ভাসতে থাকে। ঈদ উপহার এভাবেই বন্ধুত্বের মধ্যে প্রাণের ছোঁয়া এনে দেয়। সে উত্তর দেয়, তোর জন্য রেখেছি একটা ঈদকার্ড আর পুরো একটা দিন, শুধু গান শোনার জন্য! ওরা এবার ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পাস করল। অতশী ও পলি স্কুলবন্ধু। এভাবে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ঈদ এনে দিয়েছে এক অপূর্ব আবেগ-অনুভূতি। ঈদকে ঘিরে বাড়ি বাড়ি এক উত্সবমুখর পরিবেশ। সবার মনেই খেলা করছে ঈদের দিনের নানা পরিকল্পনা। নতুন নতুন জামা-কাপড় কেনায় ব্যস্ত শিশুরা। ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত মা-বাবাও। ঈদের কেনাকাটার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ঈদ উপহার। শিশু থেকে শুরু করে মা-বাবাসহ পরিবারের সকলেই আপনজনকে উপহার দেবার মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দকে পরিপূর্ণ করে। উপহার পাওয়ার মধ্যে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনি আনন্দ রয়েছে দেয়ার মধ্যেও। আর উপহার কেনার জন্যই ঢাকার দোকানে দোকানে লেগে রয়েছে ভিড়। ঈদ উপহারকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে নানা অনুভূতি খেলা করে। তাদের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হল।
পারিবারিক উপহার
ঈদের পরিকল্পনা জানতে কথা হচ্ছিল ব্যাংক কর্মকর্তা বিউটি আক্তারের সাথে। তিনি বলেন, অফিসের পর ঈদের কেনাকাটা করা খুবই সমস্যা। এর মধ্যে ছুটির দিনগুলোই একমাত্র ভরসা। প্রথম সাত রোজার পরই তারা ঈদের বোনাস পেয়েছেন। যদিও তা খুব সামান্য, তবুও তা দিয়েই কেনাকাটা করতে হবে। তার বিয়ে হয়েছে দু’বছর হতে চলেছে। এর আগের বছর রোজার ঈদে শাশুড়ী ও তার মায়ের জন্য একটি করে শাড়ি এবং শ্বশুর ও বাবার জন্য একটি করে পাঞ্জাবি কিনেছিলেন। কারো মনে যেন কোন কষ্ট না লাগে সেজন্য বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি উভপক্ষের উপহারের কেনার ক্ষেত্রে একই ধরনের অর্থ ব্যয়ের চেষ্টা করেছেন। উপহার দেবার ক্ষেত্রে সকলকে দিতে ইচ্ছা করে, তবে সেটা সম্ভব নয়। এবারের ঈদে বাড়ির ক্ষুদে সদস্য ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাতিজা, ভাতিজিদের উপহার দেবার ইচ্ছা আছে। গৃহবধূ মীরা বেগমের সাথে কথা হচ্ছিল তার পরিকল্পনা জানতে। মীরা বেগম বলেন, তার বাড়ির আয় খুবই সীমাবদ্ধ। সব কিছুর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির ফলে একজনের আয়ে ঈদের খরচ সামলানো তার জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু এর মধ্যেই তার চালাতে হবে। তিনি বলেন, ঈদের উপহার আত্মীয়তার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। প্রতিবছর বাড়ির ছোট বউ হিসেবে তিনি অনেক উপহার পান। কখনও চুলের ক্লিপ কখনও কানের দুল, তো কখনও শাড়ি। তেমনি তিনিও ঈদে শ্বশুর-শাশুড়ী, মা-বাবার জন্য শাড়ি ফতুয়া কিনতে কখনও ভুলেন না। আবার কখনও কখনও বড় ভাই-বোন, ননদ ভাসুরকে সামান্য ক্লিপ, গেঞ্জি হলেও কিছু দেবার চেষ্টা করেন।
প্রফেশনাল উপহার
ঈদে উপহারের মধ্যে দিয়ে অফিসিয়াল সম্পর্কের সাথে যুক্ত হয় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। মাসিক পত্রিকার রিপোর্টার রিয়া বলছিলেন, তারা রোজ সকাল-সন্ধ্যা অফিস করেন। অফিসের সহকর্মীদের নিয়ে তারা এক বড় পরিবার। এর আগের ঈদে তিনি তার সহকর্মী সোমাকে, তার ছয়মাসের শিশুর জন্য একটি জামা উপহার দিয়েছিলেন। সোমাও তার মেয়েকে ক্লিপ, খেলনা উপহার দিয়েছে। শুধু সোমা নয়, অফিসের সব সহকর্মীর মধ্যেই রয়েছে এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক, আর ঈদে কার্ড ও নানা উপহারের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পায়। ব্যাংক কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন বলেন, অফিসে নানা কোম্পানি থেকে অনেক সময় উপহার দিয়ে যায়, হয়ত সেটা নোট বই বা কলম, তো কখনও সাজানোর জিনিস বা ঈদ কার্ড। সেই সামান্য উপহারও তাদের সাথে এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তার পাঠানো ঈদ কার্ড ও কিছু সুন্দর শুভেচ্ছাবাণী অচেনা মানুষটিকে অনেক কাছের চেনা মানুষে পরিণত করে।
অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন নয়
অনেক সময় দেখা যায় যে, ঈদ উপহারকে কেন্দ্র করে পারিবারিক, অফিসিয়াল জীবনে শুরু হয় নানা জটিলতা। ঈদের উপহারকে কখনই অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। পারিবারিকভাবে উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে আত্মীয়দের মধ্যে কখনই অবস্থানুযায়ী উপহার বাছাই করা যাবে না। ঈদের উপহার গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রত্যেকের মনের প্রকৃত ইচ্ছাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং আনন্দ উপভোগ করতে হবে। সামান্য কার্ডের মধ্যে দিয়ে হলেও ঈদে পুরনো বন্ধুত্বকে আবার স্মরণ করার সুযোগ হয়ে ওঠে। স্কুলে থাকতে প্রত্যেক ঈদেই ক্লাসের সকলে তাদের বন্ধুকে যেমন ঈদকার্ড দেয়, তেমনি পায়। শিশু ও কৈশোরের বন্ধুত্ব নবায়নের এ সুযোগ সকলেরই কাজে লাগানো উচিত।
ঈদ উপহার: তোমার আমার
কাজী রোজী
ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে উত্সব। ঈদ মানে হূদয়ের সবটুকু অনুভব। ঈদ মানে উপহার। বাবা মা ভাই বোন আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপড়শী, অফিসের সহকর্মী, ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রের আপনজন সবাই ঈদ উপহার শব্দটির সাথে কমবেশি জড়িত। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলেরই ঈদ শুভেচ্ছা, ঈদ উপহারের একটা জায়গা রয়েছে। সেই জায়গা থেকে ঈদের আমেজ নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে, সৌহার্দ্যের ডালি নিয়ে ঈদ উপহারের আদান প্রদান ও ভাবধারার বিনিময় শুরু হয়ে গেছে। শুরু হয় ঈদের সালামী প্রথা। এই সালামী বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ঈদ উপহারও বিভিন্ন বিষয়ে হয়।
এক. গরীব-বড়লোক ভেদাভেদ ঈদ উপহারও ভিন্নতা আনে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, দেবর-ননদ, ছেলে-মেয়ে এদের কোন জুড়ি নেই। কাউকে একটু কম দামি সাধ্যমতো ঈদ উপহার প্রত্যেকের কাছে পৌঁছায়।
দুই. কর্পোরেট ব্যবসা বাণিজ্য, প্রতিষ্ঠান, তাদেরও থাকে ঈদ উপহার সামগ্রীর আনন্দ উত্সব। আদান প্রদানের মাধ্যমে সেখানেও বড় মাপের উপহার এসে যায় উপঢৌকন হিসেবে। এ যেন চমত্কার সৌষ্ঠোবের ধারাপাতের পর্যায়। কেউ নিয়ে তৃপ্তি কেউ দিয়ে তৃপ্তি। উভয় ব্যাপারেই ঈদ উপলক্ষ মাত্র। উপহার মনের আন্তরিক শুভেচ্ছা ডালি।
তিন. জামাই ঈদের বিনিময় করেন শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে মূল্যবান উপহার দিয়ে। পাশাপাশি ছেলে বৌ পরম আনন্দ অতিবাহিত করেন তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ীকে একটু বেশি মূল্যমানের পোশাক আসাক প্রদান করার মাধ্যমে।
চার. বাড়িতে যারা সকল কর্মের সহায়তা করে থাকে, তাদের প্রতিও ঈদ উপহার একটি মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। যতটা সম্ভব পোশাক পরিচ্ছদ থেকে সামান্য গয়নাগাটি (যার মূল্যমান কম হলেও) গৃহকর্মীদের প্রচণ্ড আনন্দ দিয়ে থাকে।
পাঁচ. বন্ধুরা বন্ধুদের ঈদ উপহার হিসেবে অনেক সময়ই ঈদ সংখ্যা সাময়িকী এবং বিশাল পরিসরের ঈদ সংখ্যাগুলো প্রদান করে থাকে।
ছয়. জামাই আদর বলে যে কথাটি প্রচলিত আছে তার প্রায় সবক্ষেত্রেই আনন্দের আতিশয্যে ভরিয়ে দিতে বিশেষভাবে তত্পর থাকেন শ্বশুর-শ্বাশুড়ী।
সাত. স্বামীর ঈদ উপহার স্ত্রীর জন্য আকুণ্ঠ ভালোবাসার দূত হয়ে ঘরময় ছড়ানো থাকে। স্ত্রীও তার সাধ্যমতো স্বামীকে ঈদ উপহার দিয়ে থাকে।
আমরা ঈদ উপহার, ঈদ ভালোবাসা, ঈদ সালামী যে অর্থেই অভিহিত করি না কেন ঈদ আমাদের আত্মার আলোকবর্তিকা। ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমরা ঈদ উপহারের কল্যাণে সুষ্ঠুভাবে যাপিত জীবনের অধ্যায়গুলো রচনা করি-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
