স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা

জীবনানন্দ দাশ : রূপসী বাংলার কবি

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৮
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে” এভাবেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় প্রকৃতিকে ভালোবেসে বার বার এই বাংলায় ফিরে আসার কামনা করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আধুনিক নাগরিক জীবনের হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ ও সংশয়ের চিত্র তাঁর কবিতায় দীপ্যমান। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তুলেছেন। হলুদ নদীর নরম হাওয়া, রৌদ্রের আঘ্রাণ, শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা নেমে আসা, ধানের গন্ধের মতো লক্ষ্মী পেঁচা, বাঘিনীর গর্জনের মতো অন্ধকার ইত্যাদিতে শ্রবণ, দর্শন, স্পর্শ, ঘ্রাণ সব রকম ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় তাঁর কবিতা “চিত্ররূপময়”। সত্যি তাঁর কবিতা যেনো এক একটি তুলির আঁঁচড়ে আঁঁকা চিত্র। প্রথম পাঠেই তার অর্থ অনুধাবন করা যায় না। কিন্তু যখন অনুধাবন হয় তখন হূদয় যেমন ভরে যায় এক বিশেষ গুঞ্জনে তেমনি চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরো একটি দৃশ্যপট। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ঝরাপালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, রূপসী বাংলা, মহাপৃথিবী প্রভৃতি কাব্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য, বাংলার গ্রাম মাঠ প্রকৃতি, কখনো বা মৃত্যুচেতনাকে তুলে ধরেছেন। ষড়ঋতুর মধ্যে হেমন্তের প্রাধান্যই তাঁর কবিতায় বিশিষ্ট হয়েছে। যেমন “হেমন্ত বিয়ায়ে গেছে শেষ ঝরা মেয়ে তার শাদা/মরা শেফালীর বিছানার পর”। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ভিড় করে আসে পেঁচা, শকুন, ডাহুক, শালিক, চিল আর কবিতার দেহে আছে ধূসর রঙের চিহ্ন। “হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে/তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে” ভিজে মেঘের দুপুর, ধানসিঁড়ি নদীর ধারে চিলের উদাস ডাক এক অপরিসীম শূন্যতাকেই ব্যঞ্জিত করে। শুধু তাই নয় কবির কাছে মনে হয়েছে পৃথিবীর আলো বাতাসেও যেনো মৃত্যুর হাতছানি। মানুষের মন গেছে মরে। তাই কবি বলেছেন - কাশের রোগীর মতো পৃথিবীর শ্বাস/যক্ষ্মার রোগীর মতো ধুঁকে মরে মানুষের মন। আধুনিক যুগে জীবনের মূল্যবোধগুলি যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, জীবনানন্দ সে কথা গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর মনে হয়েছিলো মানুষের হূদয় যেনো নষ্ট শসা, পঁচা চালকুমড়োর মতো। কাব্য সাধনার প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দ্বারা প্রভাবিত হলেও তাঁর পরিণত রচনায় স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতা তাঁকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে একজন প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। “কবিতার কথা” তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ। তিনি একজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিকও বটে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত উপন্যাস “মাল্যবান” এবং “সতীর্থ”। জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস গাঁওপাড়া গ্রাম, বিক্রমপুর। জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯।মৃত্যু ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪ সাল।