ডেস্ট্রয়েড ইকোনমি অব ডেট্রয়েট

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৩, ২০:৫২
উন্নতির শীর্ষে উঠেও কিভাবে ধীরে ধীরে তার ক্ষয় হয়, চোখের সামনে সম্ভবত এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট নগরী। পঞ্চাশ বছর আগেও আমেরিকার শিল্প শক্তির প্রতীক ছিলো ডেট্রয়েট। ঐ ধনী নগরীকে সবাই চিনতো মোটর টাউন বা মোটাউন হিসেবে। জেনারেল মোটরস, ফোর্ড ও ক্রিস্টলারের মতো কোম্পানির প্রধান ক্ষেত্র ছিলো সেখানে। নগরীর সেই জৌলুস এখনও কিছুটা দৃশ্যমান। গত কয়েক দশকে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর ঋণের বোঝায় ডেট্রয়েট এখন প্রায় পরিত্যক্ত নগরী। শিল্প প্রবৃদ্ধির নিম্নগামিতা থেকেই এ অবস্থার সূত্রপাত। এক সময় সেখানে সর্বোচ্চ ১৮ লাখ মানুষ বাস করতো। আর এখন অর্থনৈতিক দৈন্যতার কষাঘাতে সেখানকার মানুষ নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে পারলে বাঁচে। বর্তমানে এর জনসংখ্যা মাত্র সাত লাখে নেমে এসেছে। গত কয়েক দশকে প্রায় ৭০ হাজার প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি এখন পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে বাড়ি। এ অবস্থায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেট্রয়েটকে দেউলিয়া ঘোষণা দেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার স্টকটন, ম্যামথ লেকস ও সান বার্নারডিনো নগরীও নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছিলো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ডেট্রয়েটকে সবচেয়ে বড় দেউলিয়া নগরী হতে হচ্ছে। কিন্তু আদালতে সেই আবেদন এখন হাবুডুবু খাচ্ছে নানামুখী আইনী লড়াইয়ের মধ্যে। নগর কর্মকর্তারা বলছেন, ডেট্রয়েট নগরীর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা ১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নগরীর বাসিন্দাদের যদি এই ঋণ শোধ করতে হয়, তাহলে তাদের মাথাপিছু দিতে হবে ২৭ হাজার মার্কিন ডলার করে। অন্যদিকে, ২০০৮ সাল থেকে ডেট্রয়েটকে ঋণের লভ্যাংশ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার। ঋণের বোঝা টানতে নাগরিকদের উপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে অস্বাভাবিক হারে। ২০০২ সাল থেকে আয়কর বেড়েছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু পরিণতি হয়েছে একেবারেই উল্টো। ২০০৮ সাল থেকে জমি বা বাড়ির ট্যাক্স থেকে আসা রাজস্ব কমে গেছে শতকরা ২০ ভাগ। আমেরিকার থিংক ট্যাংক ব্রুকলিংস ইনস্টিটিউটের গবেষক জেনিফার ব্রাডলি জানিয়েছেন, ঋণবোঝার সাথে যুক্ত হয়েছে অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির দুষ্টুচক্র। আর এটাই ডেট্রয়েটের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীর প্রতিটি পর্যায়েই ভুলের ছড়াছড়ি। আর তা মোকাবিলা করতে গিয়ে কর বাড়িয়ে নিয়মিত ছাঁটাই কর্মসূচি হাতে নেয় নগর প্রশাসন। ফলে আমেরিকার অন্যান্য স্থানের তুলনায় ডেট্রয়েট সহজেই বসবাসের যোগ্যতা বা আকর্ষণী ক্ষমতা হারায়। অন্যান্য ধনাঢ্য এলাকায় আবাস গড়া যুক্তরাষ্ট্রে সহজ হওয়ায় সেখানকার বহু মানুষ তা-ই করেছে। ডেট্রয়েটে এখন কর্মরত মানুষের মাত্র ৩০ শতাংশ স্থানীয়। আর ৬১ শতাংশ ডেট্রয়েটের বাইরের। ডেট্রয়েটে এখন যে সাত লাখ ১৩ হাজার মানুষের বাস, তাদের এক তৃতীয়াংশই দরিদ্র। মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ মানুষের আবার হাইস্কুলের উপরে কোন ডিগ্রি নেই। ব্যয় কমাতে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বাতি জ্বালানোও বন্ধ করে দেয় নগর প্রশাসন। এ সুযোগে অপরাধের হার সব রেকর্ড ছাড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দেয়া পুলিশের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ২০১১ সালের হিসেবে ডেট্রয়েটে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা লাখে প্রায় ৫০ জন আর ধর্ষণের শিকার প্রায় ৭০ জন। এর সাথে সেখানে হরহামেশাই চলে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড। গত কয়েক দশকে ডেট্রয়েটে অর্থনৈতিক গতি নিম্নগামী থাকার পাশাপাশি এসব সমস্যা বাড়ছিলো ব্যাপকভাবে। তা সত্ত্বেও প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয়ভাবে কোন প্রণোদনা বরাদ্দ দেয়া হয়নি ঐ নগরকে। তবে হ্যাঁ, ডেট্রয়েট নগরীর কোন কোন অঞ্চল এখনও বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু গণসেবার মান পড়ে যাওয়ায় গোটা নগরী এখন সাহসী শিল্পোদ্যোগের বৈরী। নগরীর মেয়র নিজেই ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার পক্ষপাতি। কারণ ব্যয়বহুল আর্থিক নিয়মকানুনের সাথে তারা বেমানান। এভাবে দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে গিয়ে গোটা পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। নগরীর এমন দুর্দশার মূল কারণ ও উপায় খুঁজে পেতে ইমার্জেন্সি ম্যানেজার হিসেবে কেভিন অর নামে এক বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেয়া হয়। গত ১৯ জুলাই স্থানীয় আদালতে ডেট্রয়েটকে দেউলিয়ার ঘোষণার আবেদন জানান তিনি। সেখানে এক লাখ ঋণদাতার নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের কাছে নগরীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রার্থনা করা হয়েছে। এ সব ঋণদাতার মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি পেনশন ফান্ড। অর্থাত্ এ ধরনের ফান্ড থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণ নিয়েছে নগর প্রশাসন। এরই মধ্যে নগরীর কার্যক্রম চালু রাখতে গত মাসে অনিরাপদ ঋণ পরিশোধ করা বন্ধ করে দেয় নগর প্রশাসন। ফলে অনেকেরই পেনশন আটকে যায়। তাই শুরু থেকেই শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নগরীকে দেউলিয়া ঘোষণার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলো। এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কেভিন অর ঋণদাতাদের সাথে ফলপ্রসূ কোন আলোচনা করেননি বলেও দাবি করেন ৩৩টি ইউনিয়নের প্রধান সমন্বয়ক এড ম্যাক নেইল। ইউনিয়ন নেতারা প্রথম থেকেই চাচ্ছিলেন মামলাটি কোনভাবে যাতে মিশিগান স্টেট আদালতে নেয়া যায়। দেউলিয়ার ঘোষণার আবেদনের পরপরই এ সংক্রান্ত ২০১২ সালের আইনকে প্রদেশের আইন ও সংবিধান পরিপন্থি বলে রায় দিয়ে বসেন স্টেট আদালতের বিচারক রোজম্যারি অ্যাকুইলিনা। রায়ে বলা হয়, নাগরিকদের সংরক্ষিত পেনশন সুবিধা হুমকির মুখে পড়ায় তা আইন ও সংবিধান বিরোধী। এদিকে, গভর্নর রিক স্নাইডারের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঐ রায় পুনর্বিবেচনার আপিল করেন মিশিগান প্রদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল বিল স্কুইটি। এভাবেই বড় ধরনের আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ে গেলো ডেট্রয়েটকে দেউলিয়া ঘোষণার প্রক্রিয়া। তবে সব আইনি জটিলতা নিরসন করে বিচারক যদি দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন অনুমোদন করেন, তাহলে ঋণ শোধ করতে নগরীর সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়ার ক্ষমতা পাবে নগর প্রশাসন। বিক্রির সম্ভাব্য তালিকার মধ্যে আছে ডেট্রয়েট আর্টস ইনস্টিটিউটের মূল্যবান ও পুরোনো শিল্পকর্ম, ঐতিহাসিক বিল্লি আইল পার্ক ও বিমানবন্দর। এ সব সম্পদ বিক্রি করা হলে নগরী তার আকর্ষণ আরো হারাবে এবং আরো বহু বাসিন্দা নগর ছেড়ে চলে যাবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। ইমার্জেন্সি ম্যানেজার কেভিন অর চেয়েছিলেন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দেউলিয়া জটিলতার সমাধান করতে। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, আগামী ছয় মাসে কোন পরিবর্তন হয়তো হবে না। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকদের পাওনা পেনশন কমানো হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাও সংকুচিত করা হবে। মিশিগান গভর্নর রিক স্নাইডার ডেট্রয়েটকে দেউলিয়া ঘোষণার পক্ষে বলেন, ঐ নগরীর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, যা থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ দেউলিয়া ঘোষণা করা। এর মাধ্যমে ডেট্রয়েট আবারো শক্তি সামর্থ্য অর্জন করতে পারবে বলেও বিশ্বাস করেন গভর্নর। ডেট্রয়েট মেয়র ডেভ বিং অবশ্য সরকারি সব কর্মসূচি ও শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন চালু রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। ডেট্রয়েটের নিরাপদ ঋণদাতা হলো ব্যাংক অব আমেরিকা। প্রতিমাসে ক্যাসিনো থেকে অর্জিত রাজস্ব থেকে ১১ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার ব্যাপারে সম্প্রতি একটি চুক্তি হয়েছে। আর এতেই নগরীর কার্যক্রম চলবে বেশ ভালভাবেই।