আজ সোমবার পালন করা হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। বিশ্বের অন্যদেশের মত বাংলাদেশও দিবসটি পালন করছে। এবারে বাংলাদেশে এর প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বাঘ বাঁচান, মায়ের মত সুন্দরবন রক্ষা করুন’। বাঘ আছে এমন ১৩টি দেশে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালে থাইল্যান্ড এর হুয়াহিনে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবার ৪র্থ বারের দিবসটি পালিত হচ্ছে। বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বাঘ সংরক্ষণে জনমত গড়ে তুলতে ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে দিবসটি পালনের জন্য শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীর সর্বাধিক বাঘের সংখ্যা ভারতে, প্র্রায় এক হাজার ৭০৬ টি। এসব বাঘ ভারতের ৫৬টি বনাঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। একক বন হিসাবে পৃথিবীর সর্বাধিক বাঘের সংখ্যা সুন্দরবনে। সুন্দরবনে আছে ৪০০-৪৪০ টি বাঘ। নতুন করে ক্যামেরা স্থাপন করে বাঘ গণনা শুরু করা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে আপাতত এই গণনা বন্ধ আছে। আগস্ট মাসে আবার শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০০-২০১২ সালের মধ্যে ১৩টি টাইগার রেঞ্জ দেশে ৬৫৪টি চামড়া ও দেহাবশেষ ও হাড় জব্দ হয়েছে। এতে ধারণা করা হয়, এই সময় এক হাজার ৪২৫টি বাঘ মারা গেছে।
১৯০০ সালের প্রথম দিকে বিশ্বে এক লাখ বাঘ ছিল। বর্তমানে এই সংখ্যা এসে তিন হাজার ৭০০ তে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগামী শতাব্দীতে এই প্রাণীটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। বাঘ বনের জীব-বৈচিত্র্য, খাদ্য শৃঙ্খল ও প্রতিবেশ চক্রের প্রধান নিয়ন্ত্রক। বনের উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য তৃণভোজী প্রাণী যেমন হরিণ, শূকর ইত্যাদি শিকার করে বনের প্রতিবেশ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বাঘ বন রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী এবং একটি বনের জীববৈচিত্র্যের অবস্থা নিরূপণের নির্দেশক প্রজাতি। যে বনের অবস্থা ভালো সেখানে বাঘের সংখ্যা বেশি থাকে।
বাংলাদেশ, ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ভুটান, নেপাল ও রাশিয়ায় এখনও বাঘের অস্তিত্ব আছে। এই ১৩টি দেশ এক সাথে টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি বা টিআরসি নামে পরিচিত। ইতিমধ্যে বালিনীজ টাইগার, জাভানীজ টাইগার ও কাম্পিয়ান টাইগার বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে বাঘের পাঁচটি প্রজাতি টিকে আছে, এগুলো হল বেঙ্গল টাইগার, সাইবেরিয়ান টাইগার, সুমাত্রান টাইগার, সাউথ চায়না টাইগার এবং ইন্দো-চায়না টাইগার।
আমাদের কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা মোহা: হুমায়ূন কবির জানান, সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন । প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গণপিটুনি, চোরা শিকারসহ নানা কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষায় বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের সূত্রে জানা যায়, গত ১২ বছরে সুন্দরবন এর আশেপাশের লোকালয়ে ৩৫টির অধিক বাঘ হত্যা করা হয়েছে। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাঘ অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে।
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত বাঘের মৃত্যু হয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব ২টি বিভাগের ৪ টি রেঞ্জ পশ্চিমে খুলনা ও সাতক্ষীরা পূর্বে শরণখো্লা ও চাঁদপাই বন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়া বাঘ গণ পিটুনির শিকার হয়ে প্রায়ই মারা পড়ে। গত এক যুগে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২ টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে বেশি ১৪টি বাঘ গণ পিটুনিতে মারা গেছে।
বন বিভাগ ও এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৬ মার্চ শ্যামনগরের দাতনিখালী গ্রামে একটি বাঘ ঢুকে পড়লে এলাকাবাসী বাঘটিকে গুলি করে হত্যা করে। এর একদিন পরে একই এলাকায় আরো একটি বাঘ গণপিটুনিতে মারা যায়। ২০০৮ সালের ২০ জুন সন্ধ্যায় শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামে একটি বাঘ প্রবেশ করে ।এ সময় বাঘের আক্রমণে এক গৃহ বধূসহ ৩ জনের মৃত্যু হয় ও আহত হয় ২ জন। এ ঘটনার পরের দিন ২১ জুন এলাকাবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৯ সালের ২ জুন সুন্দরবনের চুনা নদী পার হয়ে শ্যামনগরের খলিশাবুনিয়া গ্রামের কালীবাড়ী নামকস্থানে একটি বাঘ ঢুকে পড়ে। এই বাঘের আক্রমণে ৩ জন গ্রামবাসী আহত হয়। এ ঘটনায় গ্রামবাসী ১০ ঘন্টা পর বাঘটিকে আটক করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে একটি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করে। বাঘটি আবাদ চন্ডিপুর গ্রামে খোরশেদ আলীর রান্না ঘরে চালের ওপর অবস্থান নেয়। গ্রামবাসী বাঘটিকে ঘেরাও করে বনবিভাগ ও পুলিশকে খবর দেয়। ১২ ঘন্টা পরেও বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা না করায় গ্রামবাসী বাঘটাকে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালের মে মাসে চন্ডিপুর গ্রামে লোকালয়ে আবারও একটি বাঘ প্রবেশ করলে সেটিও গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে। ২০১১ সালের ২৫ মার্চ শ্যামনগরের ভোলাখালী গ্রামে জনগণের পিটুনিতে ১টি বাঘের মৃত্যু হয়। গত ২১ জুলাই কৈখালী এলাকায় একটি বাঘ মৃত অবস্থায় দেখতে পায় এলাকাবাসী।
সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে সুন্দরবনে ২০টি বাঘ মারা গেছে। পরিবেশবিদদের মতে, গণপিটুনিতে বাঘ মৃত্যুর সংখ্যা ৩০টির কম নয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে সুন্দরবনের ১২০টি বাঘ মারা গেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ৫৩টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, আইলা ও সিডরের আঘাতে সুন্দরবন লণ্ড ভণ্ড হয়ে যাওয়ায় বন্য প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে হিংস বাঘ খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং গ্রামবাসীর গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। বন বিভাগের নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বাঘ সুরক্ষায় সুন্দরবনে ২টি ট্র্যাংকুলাইজার গান রয়েছে। তবে গান দুটি ব্যবহারের দক্ষ কোন লোক নেই। তেমনি নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ চেতনানাশক ওষুধ। সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করা এসব বাঘ সুন্দরবনে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হত, যদি ট্র্যাংকুলাইজার গানের গুলি ব্যবহার করা যেত। তার মতে জলবায়ু পরিবর্তনে দুর্যোগ, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাঘ হিংসতর হয়ে উঠেছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। যে কারণে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনিতে বেশি মারা পড়ছে। পরিবেশবিদদের মতে এভাবে বাঘ নিধন হতে থাকলে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ সুন্দরবন থেকে বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
