আগামী সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে শেষমেষ চমক দেখাতে পারে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট। নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর শঙ্কা কাটিয়ে এ জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ চমক দেখাতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল বলছেন। ইতিমধ্যে জোটের নীতিনির্ধারক মহলে এমন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।
বিরোধী নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ বলছেন, যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় সে ক্ষেত্রেও ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও জোটের নেত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্টতই বলেছেন যে, তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচনে অংশ নেবেন না। ঈদের পর নেতাকর্মীদের রাস্তায় নামার আহবান জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, বিরোধী নেত্রীর এ ঘোষণা কৌশলগত হতে পারে।
সূত্রগুলো অবশ্য বলছে, শেষপর্যন্ত বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ও তবে বেশকিছু যেমন প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, নির্বাচন কমিশনের পুুনর্গঠন এবং মামলা মোকদ্দমার মতো বেশকিছু শর্ত মানতে হবে সরকারকে।
পক্ষান্তরে একাধিক আন্তর্জাতিক মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল দেশ ও গোষ্ঠীগুলো এ মূহূর্তে বেশ তত্পর। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর যাদের কৌশলগত দায়-দায়িত্ব, এমনকি নিরাপত্তার বিষয়টি নির্ভর করে, সেসব গোষ্ঠী বা দেশ নির্বাচনে বিএনপি অংশ বিস্মিত হয়ে যেতে পারেন।
২০০৬ সালের প্রসঙ্গ টেনে ওই মহল বলছেন, সে সময় নির্বাচন হতে না দেয়ার দায় কিন্তু বিএনপিকেই নিতে হয়েছিল। আর তার ফলশ্রুতিতে দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা মানুষ শেষের দিকে আর ভাল ভাবে নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে খেসারত দিতে হয়। তাই নির্বাচন হতে না দেয়ার দায় সম্ভবত বিএনপি নিতে চাইবে না। আর সে কারণেই ইতিমধ্যেই জোটের শীর্ষ নেতারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ক্ষমতাসীন পক্ষই নির্বাচনের পথে অন্তরায় তৈরি করে রেখেছে। আর এ কথা বলার পাশাপাশি তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংসদীয় উপনির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিরোধী জোট। এরই ধারাবাহিতায় প্রথম কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করে তারা। কিন্তু এ দলেরই নেতা দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন করলে তারই বিজয় হয়-আর সরকারি দলের প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। পরে পদত্যাগী নেতা বিজয়ী হওয়ার পর আবার বিএনপিতেই যোগ দেন।
সামপ্রতিক সময়ে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি অংশ নেয়। আর এতে প্রার্থীদের বিপুল বিজয় জনসমর্থনের পাল্লা যে বিএনপির পক্ষেই তা দৃশ্যমান হয়েছে। হেফাজত ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ায়ী লীগের জনসমর্থনে অনেকটায় ভাটার টান ধরেছে সে কথা নির্বাচনী ফলাফল যেমন বলছে তেমনি লোকমুখেও বেশ জোরে সোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। লোকমুখে যারা কান পেতে থাকেন তারা এ কথা বেশ ভালভাবেই জানছেন যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে ফলাফল কী হতে পারে। তবে এ কথাও অনেকে বলছেন যে, সামান্য সময়টুকু ক্ষমতাসীনদের হাতে আছে সেটুকু ঠিক ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। কারণ উন্নয়নের পাশাপাশি অনেক সাফল্যই এ সরকার জোর গলায় বলতে পারেন। যদিও শেয়ার বাজার আর পদ্মা সেতু নিয়ে অপ্রমাণিত কিছু অভিযোগ খণ্ডনে এখন পর্যন্ত সরকার ব্যর্থতার পরিচয়ই দিচ্ছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আগামী নির্বাচন নিয়ে সংশয়-সন্দেহ যাই থাক সম্ভাব্য প্রার্থীরা কিন্তু মাঠে নেমে গেছেন। এখন ইফতার রাজনীতি চলছে রাজনীতির মাঠে। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা সংবলিত ডিজিটাল পোস্টার-ব্যানার ফেস্টুনে নির্বাচনী এলাকার শোভাবর্ধন করছে। পরিস্থিতির বাস্তবতায় এ কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, এ দেশের মানুষ নির্বাচনপ্রিয় আর সে কারণেই দল যাই ভাবুক সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে-ভাগে মাঠে নেমে পড়েছেন। মাঠের রাজনীতি কিন্তু এখন ক্রমেই নির্বাচনমুখি হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের এই নির্বাচনমুখিতা বিরোধীদের আন্দোলনে কী প্রভাব ফেলবে? এমন প্রশ্নের জবাবে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী বলছেন, বাংলাদেশকে নির্বাচন থেকে বেশি দিন দূরে রাখার সুযোগ কখনোই কেউ পায়নি-তাই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামা তাদের।
বিএনপি এবার যে নতুন ধারণার সরকারের কথা বলছে সেদিকে ঝোকও আছে সাধারণ মানুষের। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলসহ সর্বস্তরে বেশ আলোচনাও হচ্ছে। লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফকরুল ইসলামের দেয়া বক্তব্যও বিশেষ সমপ্রদায়ের মধ্যে আলোচনার খোরাক তৈরি করেছে। তিনি সেখানে বলেছেন, বিএনপি সব ধর্মের মানুষকে সমান সুবিধা নিশ্চিত করার পক্ষপাতি। যদিও এ দলটির পক্ষে এমন কথা এই প্রথম বলা হল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল অবশ্য এ কথাও বলে রাখতে চাইছেন, রাজনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর সব সময় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই নাটকীয় যে কোন পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর ভর করলে সেটাও অবাক করার মতো বিষয় হবে না।
