লঞ্চ-কেবিনের টিকিটের জন্য হাহাকার চলছে সদরঘাট নদীবন্দরে। সব টিকিট উধাও। টিকিটের আশায় রাজধানীর যানজটের দরিয়া ঠেলে গতকাল রবিবার যারা গিয়েছিলেন সদরঘাটে, তাদের প্রায় সবাই ফিরে এসেছেন ব্যর্থ হয়ে।
ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের জন্য গতকালও যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল কমলাপুর রেলস্টেশনে। তবে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ টোকেনের ব্যবস্থা করায় টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা কিছুটা কমেছে। সড়কপথে দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিটের জন্য যাত্রীরা গাবতলী টার্মিনালসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কাউন্টারগুলোতে ধর্ণা দিচ্ছেন। তবে বাস কাউন্টারগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে গত শুক্রবারই। শনিবার যারা এসেছিলেন তাদের বেশির ভাগই টিকিট না পেয়ে ফিরে গেছেন। তাই ধীরে ধীরে অগ্রিম টিকিট প্রত্যাশীদের ভিড় কমছে।
গতকাল দুপুরের পর সদরঘাট নৌ-টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুক্রবার থেকেই লঞ্চ-কেবিনের টিকিটের জন্য শত শত মানুষ ভিড় করছেন। তারা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য কেবিনের
টিকিটের আশায় ধর্ণা দিচ্ছেন লঞ্চ স্টাফদের কাছে। কিন্তু কোথাও
কেবিনের কোনো টিকিট নেই। এমনকি বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত টিকিট। এ বিষয়ে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার এক সহ-সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, বাস্তবতা হলো, ঈদ মৌসুমে কেবিনের যে পরিমাণ চাহিদা থাকে, সেই তুলনায় কেবিনের সংখ্যা খুবই কম। এ কারণে প্রায় সব কেবিন বিশেষ ব্যবস্থায় আগেই বুকড হয়ে যায়। বেশির ভাগ কেবিন লঞ্চ মালিকদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনরা পান। এর বাইরে বিআইডব্লিউটিসি ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অনুরোধে কিছু কেবিন দেয়া হয়। এ কারণে সাধারণ যাত্রীদের কেবিন দেয়া সম্ভব হয় না। এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই বলেও জানান তিনি। তার মতে যারা লঞ্চের ডেকে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক, কেবলমাত্র তারাই সদরঘাটে এসে ভ্রমণের দিন টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন। ডেকের টিকিট অগ্রিম বিক্রির কোনো ব্যবস্থা নেই।
অন্যদিকে প্রথম দুই দিনের মতো গতকালও কমলাপুর রেলস্টেশনে দিনভর যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই শনিবার রাত থেকে স্টেশনে এসে অবস্থান নেন। যারা রাত থেকে লাইনে দাঁড়ান তাদের সিরিয়াল ঠিক রাখার জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গতকাল থেকে টোকেনের ব্যবস্থা করেছে। টোকেনে যাত্রীর নাম, ঠিকানা, গন্তব্যস্থল, যাত্রার তারিখ লেখা রয়েছে। তা পূরণ করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। এর তদারকি করছেন যাত্রীরাই। নিয়ামুল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, টোকেন ব্যবস্থা চালু করায় সিরিয়াল সংরক্ষণ করতে সুবিধা হয়েছে। কেউ ব্যক্তিগত কাজে বাইরে গেলেও সমস্যা হচ্ছে না। ফিরে এসে আবার টোকেন নম্বর ধরে নিজের জায়গায় দাঁড়াতে পারছেন। তবে নির্ধারিত কাউন্টারগুলোতে দ্রুত টিকিট ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কোনো কোনো যাত্রী। ঈশ্বরদীর টিকিটের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে নুরুজ্জামান মিয়া যখন কাউন্টারের সামনে পৌঁছালেন, তখন বলা হলো ‘ টিকিট শেষ হয়ে গেছে ’। এক রাশ হতাশা নিয়ে তিনি বললেন, এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তাহলে কি লাভ হলো ?
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবু তাহের গতকাল বেলা ১১টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন। এ সময় দ্রুত টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া এবং টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কেবিন ও এসি প্রথম শ্রেণির টিকিট সীমিত হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে এত দ্রুত শেষ হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। যাত্রীদের দাবি অনুযায়ী টিকিট বিক্রির সময়সূচি এগিয়ে আনা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ অনেকে গাজীপুর থেকে আসেন টিকিট কিনতে। তাছাড়া আমাদের কর্মকর্তারা গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন। ৯টার আগে এসে কাজ শুরু করা তাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, আসন্ন ঈদ উল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও দূরপাল্লার সড়ক পরিবহনে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে গত শুক্রবার। একই দিন থেকে সদরঘাট কেন্দি ক লঞ্চসমূহের অগ্রিম টিকিট (শুধু কেবিন) বিক্রির কথা থাকলেও বাস্তবে প্রথম দিন থেকেই কেবিনের কোনো অগ্রিম টিকিট সদরঘাটে বিক্রি হয়নি। এ কারণে গত শনিবার এবং গতকাল রবিবার অনেকেই কেবিনের টিকিটের জন্য ধর্ণা দেন। কিন্তু বাস্তবে সদরঘাটে প্রকাশ্যে কোনো টিকিট বিক্রি হয়নি। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট প্রথম দিনেই শেষ হয়ে গেছে। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি চলবে আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত।
