চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মা ও মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার ভোর ৫টায় নগরীর খুলশি থানাধীন টাংকির পাহাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
আগের রাতে প্রবল বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ফাতেমা (৪২) ও তার মেয়ে কুলসুমের (১৭) সেমিপাকা ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের দেয়াল ও চাল ভেঙ্গে পড়লে দুজনই মাটির নিচে চাপা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
নিহত ফাতেমা ও কুলসুম নগরীর বন্দর থানাধীন ফকিরহাট এলাকায় ফোর এইচ গার্মেন্টসে কাজ করতেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত ফাতেমা ও কুলসুম টাংকির পাহাড় এলাকায় আলী আকবরের কলোনির বাসায় ভাড়া থাকতেন। চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক কর্মচারী আলী আকবর ২৫ বছর আগে ৯ গণ্ডা জমি কিনে সেখানে কলোনি গড়ে তোলেন।ওই কলোনির শেষ মাথায় ফাতেমা ও কুলসুমের ঘর ঘেঁষেই রয়েছে প্রায় ২০ ফুট উঁচু একটি খাড়া পাহাড়। ওই পাহাড়ের ওপরে বেলায়েত পুলিশের কলোনি নামে আরো একটি ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতি রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে রিটেইনিং ওয়ালও নেই বললে চলে। এ দুটি পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় কয়েক হাজার পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। গতকাল বেলায়েত পুলিশের পাহাড়ের অংশ বিশেষ ধসেই ফাতেমা ও কুলসুমের সেমিপাকা ঘরের ওপর পড়ে।
প্রতিবেশী রিকশা চালক জাহাঙ্গীর জানান, পাহাড় থেকে বিকট শব্দে বড় বড় মাটির দলা ফাতেমাদের ঘরের ওপর পড়ে। এ সময় ফাতেমার আর্তচিত্কার শুনে প্রতিবেশীরা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। তবে অনেক চেষ্টা করেও তারা হতভাগ্য মা-মেয়েকে মাটির নিচ থেকে টেনে বের করতে পারেননি।
নিহত ফাতেমার স্বামী মান্নানের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরেরসরাই উপজেলায়। মান্নান তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে অন্যত্র থাকেন।
এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ১৯৯৭ সালেও বেলায়েত পুলিশের পাহাড় ধসে চারজনের প্রাণহানি হয়। কিন্তু বেলায়েত পুলিশ অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাই সেখানে মানুষ বাসাভাড়া নিতে থাকে। বর্তমানে বেলায়েত পুলিশের কলোনির নিচে আলী আকবরের কলোনির প্রায় ৩৮টি পরিবার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। ফাতেমা ও কুলসুমের মত তারাও যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়তে পারেন। বিপদ জেনেও বাসাভাড়া কম হওয়ায় তারা ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে ওই কলোনিতে দীর্ঘ দিন ধরে বাস করে আসছেন।
ফাতেমার বাড়িতে কান্নার রোল
মা ও মেয়ের এই করুণ মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পানির টাংকি এলাকার পরিবেশ। খবর পেয়ে ছুটে আসেন ফাতেমার দুবোন শামসুন্নাহার ও মাসুমা, ভাই বেলালসহ আত্মীয়-স্বজনরা। ফাতেমার স্বামী মান্নানও স্ত্রী ও মেয়ের মৃতদেহ দেখতে ছুটে আসেন। তিনি জানান, একত্রে না থাকলেও তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হত।
চট্টগ্রামে গত ৫ বছরে পাহাড় ধসে কমপক্ষে দুশ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন নগরীর কুসুমবাগ এলাকায় স্মরণকালের সবচে ভয়াবহ পাহাড় ধসে ১২৭ জন মারা যান।
