বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। বিগত একযুগে ৩৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যার শিকার হয়েছে। বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষায় বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সংঘবদ্ধ শিকারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গণপিটুনি ও গুপ্তহত্যায় একের পর এক বাঘ মারা যাচ্ছে। জানা যায় গত একযুগে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন লোকালয়ে ৩৫টির অধিক বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে প্রায়শই বাঘ ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে এবং অঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। বনবিভাগের নিরাপত্তা বিভাগের প্রয়োজনীয় সংকট জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে মূল্যবান এ বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে পারছে না।
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত বাঘের মৃত্যু হয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব ২টি বিভাগের ৪টি রেঞ্জ, পশ্চিমে খুলনা ও সাতক্ষীরা,পূর্বে শরণখো্লা ও চাঁদপাই বনসংলগ্ন লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে। এভাবে গত একযুগে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ১৪টি বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যায়। গত ১০ বছরে সরকারি হিসাবে গণপিটুনিতে সুন্দরবনে ২০টি বাঘ মারা গেছে। পরিবেশবিদদের মতে, মৃত বাঘের সংখ্যা ৩০টির কম নয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সুন্দরবনের ১২০টি বাঘ মারা গেছে। বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়- ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ৫৩টি বাঘ হত্যার শিকার হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ দিলীপ কুমার দত্ত বলেন- জলবায়ু পরিবর্তন, আইলা ও সিডরের আঘাতে সুন্দরবন লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে বাঘগুলো খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং সহজেই গ্রামবাসীর গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। নাম না প্রকাশের শর্তে বনবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাঘ সুরক্ষায় সুন্দরবনে ২টি ট্যাংকুলাইজার গান রয়েছে। তবে গান দু’টি ব্যবহারের দক্ষ কোন লোক নেই। তেমনি নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ চেতনানাশক ওষুধ। সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করা এসব বাঘ সুন্দরবনে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হত যদি ট্যাংকুলাইজার গানের গুলি ব্যবহার করা যেত।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাঘ হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। যে কারণে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনিতে মারা পড়ছে। পরিবেশবিদদের মতে এভাবে বাঘ নিধন হতে থাকলে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশংকা রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি বিভাগের ডিএফও আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের বন্যপ্রাণী নিধন না করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
