তিনদিনের বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীসহ ডিএনডি এলাকার ভেতরে ও বাইরের বাড়ি-কারখানা হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। নিচু এলাকার রাস্তাগুলো এখন খালে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার বাজারে জমেছে হাঁটু পানি। বৃষ্টির পানিতে ময়লা-আবর্জনা মিশে যাওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছে। তবে গত তিনদিনে সকালের দিকে অবিরাম বৃষ্টি হলেও বিকালের দিকে কিছুটা কমে। এর ফলে খাল কিংবা ড্রেন দিয়ে পানি সরতে দেখা গেছে। তবে ডিএনডি এলাকার ভেতরে খাল ও বাইরে ড্রেনগুলোতে পলিথিন ও ময়লা আবর্জনা জমে দ্রুত পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করায় এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে এলাকাবাসীরা অভিযোগ করেছেন। তিনদিনের এ বৃষ্টিতে ডিএনডি এলাকার ২০ লক্ষ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ডিএনডি খাল দখলের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাউছুল আযম বলেন, ডিএনডিতে ১৮টি খাল রয়েছে। ১০ জন খাল দখলকারীকে উচ্ছেদ নোটিস দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে চাওয়া হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অচিরেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বেশিরভাগ রাস্তা হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়া পাড়া-মহল্লার অলিগলি এখনো পানির নিচে। অন্যদিকে তলিয়ে গেছে ফতুল্লাসহ আশপাশের ডিএনডি এলাকার নিম্নাঞ্চল। এদিকে শহরের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়ক, সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, সলিমুল্লাহ সড়কেও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া জামতলা, ডনচেম্বার, খানপুর, মিশনপাড়া, কলেজ রোড, গলাচিপা, আল্লামা ইকবাল রোড, পাইকপাড়া, দেওভোগ, নিতাইগঞ্জ, কাচারীগল্লিসহ অনেক এলাকাতে পানি জমে রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মীদের গতকাল সোমবার সকালে ড্রেন পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। বৃষ্টিতে ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডিএনডি বাঁধের ভেতর ৫৬ বর্গকিলোমিটার বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে ফতুল্ল¬ার রামারবাগ, সস্তাপুর, গাবতলা, কায়েমপুর, চাঁনমারি, ইসলামবাগ, শহীদনগর, মাসদাইর, ইসদাইর, গাবতলী, এনায়েতনগর, তল্লা, সবুজবাগ, কুতুবপুর, পাগলা, দেলপাড়া, আলীগঞ্জ, দাপা, পিলকুনি, ভুইগড়, রঘুনাথপুর, কুতুব আইল, নয়াআটি, লামাপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলি, হাজীগঞ্জ, গোপটা, গোদনাইল, ধনকুন্ডা, জালকুড়ির নিম্ন এলাকাতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।
সরেজমিনে গত রবিবার দেখা যায়, ডিএনডি এলাকার ভেতরে সদর উপজেলার ফতুল্লার ইসদাইর, গাবতলী, কাপুড়াপট্টি, টাগারপাড়, লালপুর ও সস্তাপুরসহ নিচু এলাকার একতলা কাঁচা, পাকা ও বেড়ার বাড়িগুলোর মেঝে পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়ির বাসিন্দারা খাটের নিচে ইট দিয়ে খাট উঁচু করার কাজ করছেন। ইসদাইর বটতলা এলাকার আসকর আলী বলেন, সারা রাত পানি সেচ করেছি। এখন সকাল থেকে খাটের উপর আশ্রয় নিয়েছি। কাপুইড়াপট্টি এলাকার গৃহিনী সানজিদা বলেন, রান্নাঘর তলিয়ে যাওয়ায় ডুবে আছে গ্যাসের চুলা। তাই সকাল থেকে রান্নার কাজ বন্ধ। নিচু এলাকার বাসিন্দা কাপুড়াপট্টি এলাকার লাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী নাদিয়া খাটের উপর মাটির চুলা বসিয়ে রান্না করছেন। ঘরের ঘরের ভেতর পানিতে ভাসছে স্যান্ডেল। তার বাড়ির সামনে ড্রেন থাকায় ময়লা পানি উপচে ঘরে ডুকছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ডিএনডির পানি নিষ্কাশনে যে খাল রয়েছে তা বেদখল হয়ে আছে। বিভিন্ন স্থানে খালের উপর মাচা দিয়ে ও বালু ভরাট করে আধা পাকা দোকান ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকে বেআইনীভাবে খালের উপর কৃত্রিম কালভার্ট তৈরি করে খালের স্বাভাবিকতায় বাধার সৃষ্টি করেছে। ফতুল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠান খালের জায়গা দখল করে রেখেছে। এ কারণে খাল এখন সরু নালিতে পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতার পানি সরু খাল দিয়ে দ্রুত গতিতে নিষ্কাশিত হতে পারছে না।
সরেজমিনে আরো দেখা যায়, স্থানীয়রা জুতা হাতে রাস্তা পার হচ্ছেন। মহিলারা রাস্তায় হাঁটছেন প্রায় অর্ধেক ভিজে। বৃষ্টিতে রিকশা পাওয়া যেমন কঠিন তেমনি ভাড়া নিয়ে বোঝাপড়াও বেশ কঠিন। অনেককে বাধ্য হয়ে ২ থেকে ৩ গুণ ভাড়া বেশি গুণতে হচ্ছে। এসব সমস্যা নিয়েও মানুষ কথা বলতে আগ্রহী নন। আর বলেও বা কি হবে, কে শুনবে তাদের দুর্ভোগ- এমন কথা নগরবাসীরা জানিয়েছেন।
