আনন্দ-খুশির দিন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৩, ১৮:৩৯
‘চাঁদের পালিক চড়ে এলো সবার ঘরে/ ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক— ঈদ মোবারক ঈদ।’ ঈদ আরবি শব্দ, এর অর্থ খুশি। আনন্দ-উত্সব। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর যে খুশির উত্সবটি আসে তার নাম ঈদুল ফিতর বা রোজা ছাড়ার খুশি। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এ উত্সব পালিত হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর নির্মল আনন্দসহকারে। পৃথিবীর সব উত্সব-আনন্দের প্রচলন মানুষের মনের তাগিদে। বৈচিত্র্যের মাঝে একাত্ম হয়ে ভিন্ন কিছু পাওয়ার আশায়। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবে এমনই এক প্রাণী, যে শুধু পেট পুরে খেয়ে আরাম-আয়েশে সময় পার করতে পারে না। তার মধ্যে আছে বিশেষ এক অনুভূতি বা বোধ যার আকর্ষণে সে চায় বৈচিত্র্য, আনন্দ আর বিনোদন; নিজের মনকে রাঙিয়ে নেয়ার উপলক্ষ। আর এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে নানা রকম উত্সব-অনুষ্ঠান এবং আনন্দ-বিনোদনের প্রচলন। বৈচিত্র্য আর বিনোদনপিয়াসী মানুষই এসব উত্সবের শ্রষ্টা। আমরা যদি নিয়মিত খাই-দাই, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজকর্ম নিয়ে মেতে থাকি, তাহলে একরাশ অবসাদ ও একঘেয়েমি আমাদের ওপর চেপে বসবে। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ব। মন ভালো থাকবে না। আস্তে আস্তে শরীরও খারাপ হতে থাকবে। কারণ? ঐ যে মনের চাহিদা মিটছে না, মন আনন্দের খোরাক পাচ্ছে না, বিনোদনের সুনীল আকাশে আনন্দে পাখা মেলতে পারছে না— তাই। মুসলমানদের ঈদুল ফিতরের প্রচলনও এই মনের চাহিদা মেটানোর তাগিদেই। ধর্মীয় উপলক্ষ অর্থাত্ রোজার সঙ্গে এর সংযোগ থাকলেও এর আনুষ্ঠানিকতা নিতান্তই মানবিক। তবে ধর্মভিত্তিক উত্সব হওয়ার কারণে সেই আনন্দ লাগামছাড়া নয়; আনন্দ-খুশির নামে বাড়াবাড়ি কিংবা রুচিহীনতা এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। এই আনন্দ ভারসাম্যপূর্ণ এবং রুচিশীল সংস্কৃতির বহির্প্রকাশ। আমরা জানি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সঙ্গীসাথীসহ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। মদিনায় যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান যে, সেখানকার মানুষেরা বিশেষ দুটি দিন উত্সব হিসেবে উদযাপন করে এবং এ উপলক্ষে আমোদ-ফূর্তি করে। তিনি মদিনার লোকদের কাছে এই উত্সব সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলে যে, এ দুটি দিন হলো হাসি-তামাশা ও আনন্দ-বিনোদনের দিন। একথা শুনে মহানবী (স.) মন্তব্য করেন— মহান আল্লাহ্ এই দুটি দিন অপেক্ষা উত্কৃষ্টতর আরো দুটি দিন তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার নাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। মহানবী (স.)-এর একটি হাদিসে এ ঘটনাটির উল্লেখ আছে। মহানবী (স.) ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও সুরুচিশীল মানুষ। মদিনায় যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারছিলেন, একটু বৈচিত্র্য, একটু নির্মল আনন্দ মুসলমানদের জন্য খুবই দরকার। আরবের প্রচলিত আনন্দ-উত্সবগুলো রুচির মানদন্ডে মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য হবে না বলেই বিকল্প আনন্দ-উত্সবের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন তিনি। এদিকে হিজরি দ্বিতীয় সাল অর্থাত্ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ এসে গেল। এ বছর মক্কার অবিশ্বাসীদের সঙ্গে মদিনার মুসলমানদের এক ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার নাম বদর যুদ্ধ। মাত্র ৩১৩ জন সৈন্য নিয়ে মুসলমানরা ১ হাজার সৈন্যের শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং বিজয়ী হন, যা ছিলো রাসূল (স.) ও তাঁর সাহাবীদের (সঙ্গীদের) জন্য এক মহা আনন্দের উপলক্ষ। কারণ, বলা হয়ে থাকে— এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী না হতে পারলে ইসলামের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিলো। এজন্যই ইতিহাসে এই যুদ্ধকে বলা হয় ‘ডিসিসিভ ব্যাটল’ বা চূড়ান্ত যুদ্ধ। এ ছাড়া, রাসূল (স.) তার মেয়ে ফাতিমার (রা.) বিয়ে দেন হযরত আলীর (রা.) সঙ্গে— এটিও পরম আনন্দের ঘটনা। রমজান মাসের শেষ দিন। এই দুটি আনন্দের ঘটনা এবং মুসলমানদের নির্মল আনন্দ-বিনোদনের দিকটি বিবেচনা করে মহানবী (স.) ঘোষণা করলেন, আগামী কাল ঈদ— ঈদুল ফিতর। এভাবেই শুরু ঈদুল ফিতর বা রোজা ছাড়ার উত্সবের। রমজান মাসে দীর্ঘ ত্রিশটি দিন রোজা পালন খুবই কঠিন কাজ— এটি ফরজ বা অবশ্যকরণীয় ইবাদত। সারাদিন খাওয়া নেই, পানি পান করা নেই। পরম ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোজাদার রোজা পালন করেন। এই কষ্টকর ইবাদতের জন্য রোজাদারের পুরস্কার আল্লাহ নিজেই দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। এটি রোজাদারদের জন্য বিশেষ সুখবর, খুশির কথা। এমন খুশির উপলক্ষ যে রোজা তার সমাপ্তিতে উত্সব-আনন্দের জোয়ার বয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। ঈদের দিনে আমরা নতুন নতুন জামাকাপড়, জুতো পরি। সুগন্ধি মাখি। কিছু মিষ্টিমুখ করে বড়দের সঙ্গে ঈদগাহে যাই। জামাতে ঈদের নামাজ পড়ি। সবার সঙ্গে কোলাকুলি আর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি। ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অবশ্য একটি জরুরী কাজ করতে হয়, তাহলো ফিতরা প্রদান। ফিতরা হলো গরিব-দুস্থ-অসহায়দের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের দান, যা বিত্তবানদের জন্য অবশ্যপালনীয়। এই দানের সামগ্রী হলো প্রধান খাদ্যশস্য— আমাদের দেশে চাল বা গম। এই ফিতরার দুটি দিক— একটি তাত্ত্বিক, অন্যটি বাস্তব জীবনের সঙ্গে জড়িত। তাত্ত্বিক দিকটি হলো— ইসলামী বিধানমতে ফিতরা রোজার ত্রুটি দূর করে রোজাকে পরিপূর্ণ করে; ফলে রোজার সওয়াব পুরোপুরি পাওয়া যায়। বাস্তব দিকটি হলো— আমাদের সমাজে অসংখ্য গরিব-নিঃস্ব-অসহায় মানুষ রয়েছে, যারা দু’বেলা দু’মুঠো খাবার পায় না। থাকার জায়গা নেই। অভাব আর দুঃখ-কষ্ট এদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এরা যাতে সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে, সে জন্যেই ফিতরার বিধান। এ ছাড়া গরিব-দুঃস্থদের কল্যাণের জন্য আরো একটি বিধান আছে— তার নাম যাকাত। সমস্ত খরচ-খরচা বাদে বছরশেষে কোনো মুসলমানের যদি সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সাড়ে ৭ তোলা সোনা বা এর সমপরিমাণ টাকা থাকে তাহলে তাকে শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে যাকাত দিতে হবে, যা পাবে গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষেরা। ধনীদের জন্য যাকাত দেয়া ফরজ বা আবশ্যিক। যাকাত কোনো করুণার দান নয়, এটি দরিদ্রদের অধিকার। আমাদের দেশে সাধারণত রোজার মাসেই যাকাতের টাকা, নতুন কাপড় ইত্যাদি দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয় বলে এটিও গরিবদের ঈদ উত্সব পালনে সহায়ক হয়। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ঈদের আনন্দ একেবারেই একতরফা নয়। নিজে পেট ভরে খেলাম, ভালো ভালো জামাকাপড় পরে ফুর্তি করে বেড়ালাম, গরিব-দুঃখী অভাবীদের দিকে ফিরেও তাকালাম না— এধরনের আনন্দ প্রকৃত আনন্দ নয়। ধনী-গরিব সবাই মিলে আনন্দ করতে পারার মধ্যেই তো প্রকৃত আনন্দ।