রেজাউল হক কৌশিক
অন্তরা আহমেদ। পোলিওয়ে আক্রান্ত হয়ে ছোটকাল থেকেই দু’পা অচল হয়ে যায়। এরপর মনের জোরে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিণা পার করেছেন। দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি এবি ব্যাংকে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার হিসাবে চাকরি নিয়েছেন। পৌঁছেছেন ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত এ ব্যাংকের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পর্যন্ত হয়েছেন। দীর্ঘ ২৯ বছর চাকুরি করে সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন এ নারী।
একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। জীবনের শুরু থেকেই জীবনের সঙ্গে লড়াই করে সফল হয়েছেন তিনি। আত্মবিশ্বাসই তাকে সকল বাধা দূর করে সামনে এগিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। অন্য কলিগদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটাও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মনে করেন অন্তরা। তিনি বলেন, নিজের মনের জোরের পাশাপাশি এবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতাই আমাকে এ পর্যায়ে আসতে সহায়তা করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক না হলে হয়তো চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া পথ থাকতো না। তিনি বলেন, চাকরির শুরুতে ব্যাংকের হেড অফিসে থাকলেও চাকরির বাকি সময় কারওয়ান বাজার শাখায় ক্লাইন্ট সার্ভিসমূলক কাজ করেছি। সেটাও অনেক কঠিন বিষয় ছিল।
সাহসী এ নারীর চাকরি থেকে অবসর উপলক্ষ্যে এবি ব্যাংক ব্যতিক্রমি সংবর্ধনার আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) তারিক আফজাল বলেন, তিনি একজন বিশেষ মানুষ। তাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। দীর্ঘ ২৯ বছরের চাকরিজীবনে তিনি কখনো অফিসে দেরি করে আসেননি এবং জুনিয়র অফিসার থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন। অঙ্গ দুর্বলতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। মানসিক শক্তি দিয়ে তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন, জীবনকে জয় করেছেন।
চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এখন তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েদের জন্য কাজ করতে চান। নিজের নামে একটি ট্রাস্ট করতে চান। যাতে তার মৃত্যুর পরেও এ ধরণের শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েরা পড়াশুনাসহ জীবন গঠনের জন্য সহায়তা পেতে পারে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন তিনি। তাদের জীবনকে আনন্দময় করতে এ নারী নানা প্রয়াস চালাচ্ছেন। অবিবাহিত একা জীবন এসব ছেলে মেয়েদের জন্যই কাটিয়ে দিতে চান তিনি।
অন্তরা’র জন্ম ১৯৬৪ সালের ১ জানুয়ারি এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছয় বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অন্য দশ শিশুর মতো শৈশব কাটেনি তার। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হন তিনি। ১৯৭৫ সালে অপারেশনের ফলে কোনোমতে দাঁড়াতে সক্ষম হন। ভর্তি হন রাজশাহী সরকারি পিএন গার্লস হাইস্কুলে। অন্তরা আহমেদ এসএসসি পাস করেন ১৯৭৯ সালে, ১৯৮১ সালে এইচএসসি, ১৯৮৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং পরে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৯০ সালে এবি ব্যাংক যোগ দেন। এরপর ২৯ বছর কাটিয়ে দেন একই প্রতিষ্ঠানে। এই দীর্ঘ সময়ের পথচলায় তিনি দিয়েছেন তার মেধা, শ্রম— সবই। কাজ করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
