ভারতবর্ষে যখন প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হয় সে ট্রেনটিতে ছিল তিনটি ফার্স্ট ক্লাস, দুটি সেকেন্ড ক্লাস কামরা। থার্ড ক্লাসের প্যাসেঞ্জারদের জন্য ছিল তিনটি ছাদখোলা ওয়াগন এবং গার্ডের জন্য একটি ব্রেক ভ্যান। ট্রেনটির ৩০০ জন যাত্রীবহনের ক্ষমতা ছিল। ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া ধার্য হলো ৩ টাকা এবং থার্ড ক্লাসের ভাড়া সাত আনা। ট্রেনে চড়ার জন্য ৩০০০ দরখাস্ত জমা পড়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে ৯০ ভাগ যাত্রীকেই হতাশ হতে হয়েছিল। তাদের কাছে এই ট্রেন এত দ্রুতগামী মনে হয়েছিল যে প্রথমে তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি যে তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। এতেই বোঝা যায় ট্রেন জন্মলগ্ন থেকেই জনপ্রিয় একটি বাহন।
ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৪ সালে এ জে কিং সাহেবকে বাংলায় সড়ক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিযুক্ত করে। তাকে বলা হয়েছিল, নদীবিধৌত সমতল ভূতলে প্রস্তাবিত সড়ক যেন নদ-নদীর পানি প্রবাহ ব্যাহত না করে। তাকে আরো বলা হয়েছিল মেটাল রোড, ট্রাঙ্ক রোড, রেলস্টেশন, বড় শহর ও হাট-বাজারের ফিডার হিসেবে এ সড়ক কাজ করবে আর রেলপথের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার জন্য। ঔপনিবেশিক শক্তি হলেও তাদের পরিকল্পনায় সমন্বয় ও যুক্তি ছিল। এর পরিচয় এত বছর পরও পাওয়া যায়। রেলপথ, যা তাদের অবদান, তার একটি স্টেশনও ’৮৮ ও ’৯৮ সালের দেশব্যাপী বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
আমরা ঠিক এর বিপরীতটি করেছি। আমাদের নীতিনির্ধারকরা জেলা, উপজেলা, ছোট-বড় সব শহর থেকে রাজধানীতে আসতে খাল-বিল, নদী-নালা যা পথে পড়েছে সবগুলোর ওপর অন্ধের মতো পুল, কালভার্ট, ব্রিজ বানিয়ে একমুখী ঢাকাগামী সড়কপথ গড়েছে। নৌ ও রেলপথও যে জাতীয় পরিবহনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত, তার তোয়াক্কা করেনি। রেল ও মহাসড়ক পথের ম্যাপ পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে অধিকাংশ রেলপথ প্রধান প্রধান নদ-নদীর অন্তরায় হয়নি, যা ব্রিটিশরা করে গেছে; কিন্তু সড়কপথে দেশ গিজগিজ করছে।
মহাসড়ক উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ও এডিবি স্বপ্রণোদিত হয়ে বড় আকারের সাহায্য দিয়েছে। জাতীয় পরিবহনব্যবস্থা বলতে তারা শুধু সড়কপথই ধরে নিয়েছিল। বিশ্বের উন্নত সব দেশেই পরিবহনব্যবস্থায় রেলপথ প্রাধান্য পাচ্ছে যদিও সেসব দেশে শক্তিশালী অন্যান্য মাধ্যমের পরিবহন নেটওয়ার্ক রয়েছে। নদীমাতৃক দেশ হয়েও এতে নৌপথ কেন অন্তর্ভুক্ত হয়নি, রেলপথই বা কেন এর বাইরে রাখা হয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা কি জানতেন না? তাঁরা তো বিদেশি নন। তাঁরা বছরের পর বছর সড়ক, রেল ও নৌপথে পরিবহন উন্নয়ন জেনেশুনে সমন্বয়হীনভাবে গড়ে তুলেছেন। তারই খেসারত দিচ্ছে জাতি। এমন পরিণতি একদিনে হয়নি আর তা দূর করাও একদিনে সম্ভব নয়।
সরদার খোশবন্ত সিংয়ের লেখায় পড়েছিলাম, ইন্ডিয়ান রেলে নিয়মিত বিনা টিকেটে যাতায়াতকারী একজন ডব্লিউটি কামরায় লিখে রেখেছিল : ‘আনা ফ্রি, যানা ফ্রি, পাকড় গায়া তো খানা ভি ফ্রি’; অর্থাত্ আসা-যাওয়া ফ্রি, ধরা পড়লে জেলহাজত, যেখানে খাওয়াও ফ্রি। আর আমাদের দেশের রেলের ফার্স্ট ক্লাস কামরা সংলগ্ন টয়লেটে লেখা ছিল, ‘ইহা (রেলের বগিগুলো) জনগণের সম্পত্তি। অতএব ইহার রক্ষণাবেক্ষণ আপনারই দায়িত্ব’। ছিঁচকে চোর টয়লেটের আয়নাটি চুরি করে নেওয়ার সময় লিখে রাখাল’— ‘আমার ভাগেরটা আমি লইয়া গেলাম’।
অনিয়ম-অব্যবস্থা, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, সরকারিভাবেই বিমাতাসুলভ আচরণের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে বন্দি হয়ে সম্ভাবনাময় রেলওয়ে খাতটি বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। একসময়ের লাভজনক রেলওয়ে খাত নব্বই দশক থেকেই লোকসানের ঘানি টানতে থাকে। সময়ের চাহিদানুযায়ী উন্নয়নের উদ্যোগ না নেওয়ায় অব্যাহত লোকসান আর হরিলুটের বোঝা বইতে বইতে গৌরবময় রেল রীতিমতো অভিশাপ হয়ে উঠেছে। কোনো অপারেশনের জন্য তিনটি উপাদান আবশ্যকীয়। যেমন মেশিন, ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন আর এনভায়রনমেন্ট। রেলের এ তিনটি উপাদানই আজ অচল। ইঞ্জিন, জনবল আর স্টেশন— তিনটিই রেলে সংকুচিত। মেশিন, এনভায়রনমেন্ট কার্যোপযোগী থাকলেও ম্যানের অভাব হলে স্টেশনও চলবে না, কোচও নড়বে না।
একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭ বর্গকিলোমিটারের ৭৫ শতাংশ স্থলভাগ; বাকি জলাশয়, নদী-নালা, অরণ্য ও চারণভূমি। এটুকু জায়গায় ১৬ কোটি লোকের বসবাস। প্রতিনিয়ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মিত হওয়ায় ওই ৭৫ শতাংশ জমিও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতব্যবস্থা শুধুমাত্র সড়ক ব্যবস্থাপনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য সমন্বিত পরিবহন নীতির প্রয়োজন।
মানিকগঞ্জ
