আসুন, সবাই মিলে হরতালকে ‘না’ বলি

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৩, ২১:৪৭
ভাষাগত দিক থেকে ‘হরতাল’ একটি গুজরাটি শব্দ। বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, এ দেশে ‘হরতাল’ শব্দটি ধ্বংসাত্মক এবং আতঙ্কের একটি শব্দে পরিণত হয়েছে। মূলত হরতাল বিভিন্ন সংগঠনের দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি মাধ্যম এবং তা একটি গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে হরতালের কারণে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর দীর্ঘস্থায়ীভাবে যে ধরনের কুপ্রভাব পড়ছে এবং চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তা সহ্য করার মতো ক্ষমতা আমাদের দেশের আছে কি? নিশ্চয় না। হরতালের কারণে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি যে কীভাবে ব্যাহত, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হরতালের কারণে বহির্বিশ্বে এ দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ কার্যক্রম নিরুদ্যম হয়ে পড়ছে। সমপ্রতি মানবতাবিরোধী বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে উপর্যুপরি চারদিন হরতাল পালিত হলো। যদিও এই চারদিনের হরতাল-ই এ দেশে প্রথম নয়, এর আগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে দেশে অসংখ্যবার হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন হরতাল এদেশের সংস্কৃতিতে নতুন এক মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে। একটি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই হরতাল পছন্দ করেন না। হরতালের কারণে এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সমাজসহ সকলেই উদ্বিগ্ন। ঘনঘন হরতাল পালন ও হরতাল আহ্বান করায় এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, বাংলাদেশ কি হরতালের দেশ হতে চলেছে? এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব হরতালে শুধু জনগণের প্রাণহানিই ঘটছে না। দেশের অর্থনীতিরও মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ছেন সেশনজট নামক কালো থাবার কবলে যা তাঁদের জীবনে বয়ে আনছে অপূরণীয় ক্ষতি। এ কথা সকল গণতান্ত্রিক দেশেই স্বীকৃত যে, রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাসহ সবদিক থেকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ফল হচ্ছে উলটো। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে হরতাল আহ্বান করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে। আর এতে করে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেক্টর কি এগুচ্ছে নাকি অনেকধাপ পিছিয়ে যাচ্ছে? স্বাভাবিকভাবেই রমজান মাসে মানুষের অর্থনৈতিক তত্পরতা বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সরব হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারের রমজানের শুরু থেকেই দেশ যেভাবে হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলে পড়েছে, তাতে করে দেশের অর্থনীতির অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ দেশের ক্ষুদ্র, বড় ও মাঝারি থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসায়ীর বড় মৌসুম হচ্ছে রমজান তথা ঈদের সময়। কিন্তু এই সময়ে যদি ধারাবাহিকভাবে হরতাল আহ্বান করা হয়, তাহলে তাঁদের বেচা-বিক্রি কীভাবে হবে? অনেক ব্যবসায়ীকেই এবার বলতে শোনা গেছে, ‘রমজান মাসে ধারাবাহিকভাবে হরতাল দিয়ে আমাদের পেটে লাথি মারা হচ্ছে। হরতাল আতঙ্কে ক্রেতারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মার্কেটে আসতে নারাজ। ফলে ব্যবসায় বড় ধরনের ভাটা পড়ছে।’ শুধু ব্যবসায়ীরা নন, রমজানে এই হরতালের কারণে দেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছায় তা কি হরতাল আহ্বানকারীরা একবারও ভেবে দেখেন? হরতালের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বাড়ছে মানুষের নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের শিল্পাঙ্গন। হরতালের কারণে দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উত্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের আমদানি-রফতানি খাত। দেশের একটি প্রধান বণিক সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, সহিংস হরতালের কারণে বছরে জিডিপির ৭ শতাংশ ক্ষতি হয়। আর একদিনের হরতালেই ক্ষতি হয় প্রায় শত শত কোটি টাকার। শুধু তৈরি পোশাকখাতেই ক্ষতি হয় দিনে ৩৬০ কোটি টাকা। আর বছরে যদি ৪০টি হরতাল হয় তাহলে ৬৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে হরতালের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এখন চলছে মহাবিপর্যয়, মহাসংকট। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের ২৫তম বৃহত্ অর্থনীতি হলেও একের পর এক অর্থহীন, অবিবেচক ও সহিংস হরতাল ডেকে দেশের অর্থনীতিকে পেছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর এর ফল আত্মবিধ্বংসী হতে বাধ্য এবং এর খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে। বস্তুত সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশা হরতাল বন্ধে দেশের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবীমহল, সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজসহ সকল রাজনৈতিক দলের দ্রুত সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। প্রয়োজন দাবি আদায়ে হরতালের বিকল্প কোনো পন্থা খুঁজে বের করা। সবাই মিলে হরতালকে ‘না’ বলার ব্যাপারেও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। আর এ ধরনের সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেওয়া হবে ততোই তা দেশ-জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। এ ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলেরই ভালোভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যে দল হরতাল আহ্বান করে দেশে অস্থিশীলতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তার কুপ্রভাব কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনের সময় ওই দলের ওপর পড়ে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এও বোঝা উচিত যে, জনগণ এখন আর বোকা নয় এবং জনগণকে বোকা ভাবার কারণ নেই। জনগণ যে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো যে কোনো সময় বিষ্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম, তার প্রমাণ কিন্তু তারা ইতিমধ্যে বেশ শক্তভাবেই দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা