চলে গেলেন ইতিহাসের সাক্ষী শব্দসৈনিক কবি বেলাল মোহাম্মদ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নায়ক তিনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম সাংগঠনিক তত্পরতা। বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গঠিত হয়েছিল তারই নেতৃত্বে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক তারও সাক্ষী তিনি। তার রচিত বইয়ে তিনি বর্ণনা করেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দে ্র স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের বিবরণ।
শুভ্রবসন সবসময়ের সঙ্গী তার। মৃত্যুতেও সেই শুভ্র কাফনেই জড়ানো হলো তাকে। গতকাল মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার দিকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিত্সাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহে...... রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিলো ৭৭ বছর।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তি শোক প্রকাশ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের একমাত্র সহজলভ্য প্রচার মাধ্যম ছিল রেডিও। তত্কালীন পাকিস্তান বেতারের তিনজন পথপ্রদর্শক শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ্ আল ফারুক এবং প্রয়াত আবুল কাশেম সন্দীপ ২৬ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যাবেলায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ৮৭০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র” নামে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন। এই বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ও ২৫ শে মার্চ ১৯৭১’এ তার পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণাভিত্তিক তারবার্তার আদলে স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান ২৬শে মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট থেকে সমপ্রচার শুরু করেন তারা। ২৬ মার্চ থেকে যে মুক্তিযুদ্ধ তারা শুরু করেছিলেন সেটাই পরে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
বেলাল মোহাম্মদের মেয়ে রুমানা শফি শেষ সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সোমবার রাত দশটার পর থেকে তিনি আর চোখ মেলেননি। চিকিত্সকরা জানান, তার কিডনি কাজ করছে না। অন্যান্য অঙ্গও অবশ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার দিকে চিকিত্সকরা তার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলেন।’
রুমানা শফি জানান, বেলাল মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরেই কিডনিসহ নানা রকম বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন। তবে গত সপ্তাহে তিনি হঠাত্ করেই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি চিকিত্সকরাও তার রোগ ধরতে পারছিলেন না। সোমবার দুপুরে তিনি তার বন্ধু শেখ হাফিজুর রহমানের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে বিকেলে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিত্সার জন্য সোমবারই তার কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিলো।
আজ সকালে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ জানান, সকালে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে তার বাসভবন সংলগ্ন বায়তুল আমান জামে মসজিদে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ বুধবার সকাল ১১টায় সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আনা হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার দেহ চিকিত্সা বিজ্ঞানের গবেষণার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা হবে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
কবি বেলাল মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম মাহমুদা খানম এবং বাবার নাম মৌলভি মোহাম্মদ ইয়াকুব। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম চট্টগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি দৈনিক আজাদীতে উপ-সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং ঐ বছরই রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে যোগ দেন। উত্তাল একাত্তরেও তিনি চট্টগ্রামেই কর্মক্ষেত্রে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। নির্লোভ মুক্তিযুদ্ধের এই শব্দ-সৈনিক স্বাধীনতা পদকটি বাংলাদেশ বেতারে দান করেন এবং নগদ অর্থ দিয়ে সন্দ্বীপে নিজ গ্রামে কমরেড মোজাফফর আহমেদ লালমোহন সেন ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্তকালে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা পুরস্কারের চেয়ে অনেক বড় পুরস্কার আমাকে দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ ঘোষণা করেছিলেন একটা সার্কুলারে। কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই অভিশপ্ত ১৫ আগস্ট সংঘটিত হওয়ায় ওই পুরস্কার আর কার্যকর হয়নি। ওই পুরস্কারটাকেই আমি অনেক বড় করে দেখি।’ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা স্বর্ণপদক হাতে ঝুলানোর চেয়ে বঙ্গবন্ধুর সময় ওনার স্বাক্ষরে ঘোষণা করা হয়েছে - এটা আমার বড় পাওয়া।’
শেষ জীবনে বড্ড একাকী জীবনযাপন করেছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। ১৯৭৩ সালে তার স্ত্রী বিয়োগ ঘটে। এরপর ১৯৯৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে আনন্দকে হারিয়ে তিনি একেবারে ভেঙে পড়েন। মূলত এরপর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
বেলাল মোহাম্মদের অবদান সম্পর্কে দেশবরেণ্য শিল্পী হাশেম খান স্মৃতিচারণে লিখেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই কিংবদন্তি যদি স্বাধীন বাংলা বিপ্ল¬বী বেতার কেন্দ্র সমযুদ্ধকালীন সময় চালু না রাখতেন, তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কি রকম হতো তা এখন ভাববার বিষয়! বেলাল মোহাম্মদ শুধু যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক বলেই দেশপ্রসিদ্ধ ব্যক্তি তা নয়। তিনি একাধারে একজন সুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। এই ঋষিতুল্য ব্যক্তি জীবনে সমস্ত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকেছেন। বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে তিনি নিজেকে জড়িত রেখেছেন। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। সাদা ফতুয়া, সাদা ধুতি আর কিছু বই নিয়েই ছিল তার সাম্রাজ্য। স্ত্রী, ছেলেকে হারিয়ে জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। লেখালেখি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণায়ই তিনি আনন্দ পেতেন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি অনেকগুলো বই লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে—স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আর এক মুক্তিযুদ্ধ, সাকিন সনদ্বীপ, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, জয়বাংলা রেডিও, আমানটোলার সুফি, শয়তান, অন্যকূলে পলিমাটি, পর্যায়ক্রমিক, অন্তরঙ্গ আলোকে কমরেড মুজাফফর আহমদ, মরণজয়ী লালমোহন সেন, চিত্ররূপা প্রভৃতি বই। এছাড়াও ষাটের দশকে প্রয়াত আবুল কাসেম সন্দ্বীপের যৌথ সম্পাদনায় সন্দ্বীপের ইতিহাসমূলক বই ‘সন্দ্বীপ সন্দর্শন’।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে বেলাল মোহাম্মদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তার সক্রিয় ভূমিকার কথা জাতি চিরকাল মনে রাখবে। তার মত একজন সদা গণতন্ত্রপ্রেমী প্রকৃত দেশপ্রেমিককে হারানো জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, ‘তিনি সব সময় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভালোবাসতেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিককে হারালো। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সদা প্রেরণাদায়ী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকাসহ মুক্তিযুুদ্ধে তার অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ করবে।’
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী শোকবাণীতে বলেন, ‘বেলাল মোহাম্মদ তার চিন্তা- চেতনা, দূরদৃষ্টি, অসাম্প্রদায়িতকা ও নিরপেক্ষ ভাবনার মাধ্যমে সমাজকে আধুনিক, প্রগতিশীল ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে গেছেন।’
এছাড়াও তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদের মৃত্যুতে আরো শোক জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া বাংলা একাডেমী, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন কবি বেলাল মোহাম্মদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
জেপির শোক প্রকাশ
বেলাল মোহাম্মদের ইন্তেকালে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংগঠন ও সম্প্রচারে তার অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
২৫১ সাংস্কৃতিক কর্মীর শোক
কবি বেলাল মোহাম্মদের মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের ২৫১ সাংস্কৃতিক কর্মী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোক বিবৃতিতে জোটের সভাপতি তারানা হালিম এমপি, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দ হাসান ইমাম, এটিএম শামসুজ্জামান, আসাদুজ্জামান নূর এমপি, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এমপি, আলী জাকের, ফেরদৌসী মজুমদার, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, মোবারক আলী শিকদার, খায়রুল আলম সবুজ, ড. ইনামুল হক, লিয়াকত আলী লাকী ও কবি হালিম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানাসহ জোটের ২৫১ কর্মী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
