আজ ২১ রমজান। দেখতে না দেখতে আমাদের মাঝ থেকে রহমত ও মাগফেরাত দশকের বিশটি রোজা বিদায় হয়ে গেলো। আজ নাজাত বা জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভের দশকের প্রথম দিন। মহিমান্বিত রজনী বা লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করার জন্য প্রত্যেক মসজিদে এখন অসংখ্য ঈমানদার রোজাদারগণ ই’তেকাফ পালন করছেন। রসূল (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশদিন ই’তেকাফ পালন করলো, সে যেন হজ্ব ও ওমরা করলো (বায়হাকী)। মহানবী (স.) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মাত্র একদিন ই’তেকাফ করবে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে এমন একটি গর্ত সৃষ্টি করে দেবেন যার দূরত্ব আসমান ও জমীনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের সমান হবে (তাবারানী আওসাত, হাকেম, বায়হাকী)। বিখ্যাত তাবেঈ হাসান বসরী (রহ.) থেকে বর্ণিত, ই’তেকাফকারীর জন্য প্রত্যেক দিনের বদলে একটি করে হজ্বের নেকী রয়েছে (তাবারানী, বায়হাকী)। উল্লেখ্য, বিশ্বনবী (স.) নবী হবার আগে দীর্ঘদিন যাবত্ গারে হিরায় ই’তেকাফরত অবস্থায় আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন (বুখারী-১ম খণ্ড)। যে বছর রসূল (স.) ওফাত পান সে বছর বিশ দিন ই’তেকাফ পালন করেন (বুখারী, আবু দাউদ)। আরও উল্লেখ্য, রসূল (স.)-এর পূর্বে বিভিন্ন জাতির মধ্যে ই’তেকাফের প্রচলন ছিল। তারা তাদের অলীক উপাস্যের সামনে ই’তেকাফ করতো। মক্কার অংশীবাদীরাও ই’তেকাফ করতো।
যেমন-হযরত ওমর (রা.) একবার নবী (স.)কে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি জাহেলিয়াতের যুগে মসজিদুল হারামে ই’তেকাফ করার মান্নত করেছিলাম। নবী (স.) বলেন, তাহলে তুমি তোমার মান্নত পূরণ করো (বুখারী, মুসলিম ও মেশকাত)। এছাড়া অন্যান্য জাতির ই’তেকাফের ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে হুকুম দিয়েছিলাম যে, তোমরা তাওয়াফকারী ও ই’তেকাফকারীদের জন্য আমার ঘরকে (বায়তুল্লাহ) পূতঃ পবিত্র রাখো। (সুরা বাকারা-১২৫ আয়াত)।
তাই ই’তেকাফের বিষয়টি নতুন কোনো ব্যাপার নয়। সুতরাং আমাদের মধ্যে যাঁরা ই’তেকাফ পালন করছেন, তাদের জন্য কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় মেনে চলতে হবে। করণীয় বিষয় হলো— ই’তেকাফ অবস্থায় খুব বেশি নফল ইবাদত করা। যেমন-নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, বিভিন্ন রকম তাসবীহ, তওবা, এস্তেগফার, নবীর প্রতি দুরুদ পাঠ ও দো’য়া প্রভৃতি আমলের মধ্যে নিবিষ্টভাবে মগ্ন থাকা (ফিকহুস সুন্নাহ ১ম খণ্ড)। ই’তেকাফরত অবস্থায় মাথা আঁচড়ানো, নখ কাটা, গোসল করা, খুশবু মাখা, ভাল কাপড় পরাতে কোন আপত্তি নেই। যেমন আয়শা (রা.) বলেন, রসূল (স.) মসজিদে ই’তেকাফরত অবস্থায় আমাকে তাঁর মাথাটা এগিয়ে দিতেন। আমি হুজরার ফাঁক দিয়ে তাঁর মাথাটা ধুয়ে দিতাম। মুসাদ্দাদের বর্ণনায় আছে আমি তাঁর মাথা আঁচড়ে দিতাম (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও ফিকহুস সুন্নাহ)।
হযরত আয়শা (রা.) বলেন, ই’তেকাফকারী জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে আসতে পারবে না। তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে পারবে না। জানাজায় শরীক হওয়া ও রোগী দেখতে যাওয়া তার জরুরি নয়। তবে প্রয়োজনে আসতে পারবে (আবু দাউদ)। তাছাড়া আলী (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি ই’তেকাফ করবে সে যেন গালিগালাজ না করে, অশ্লীল কথা না বলে। নিজ পরিবারকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোন হুকুম দিতে পারবে প্রয়োজনে। কিন্তু তাদের নিকট বসতে পারবে না (আহমাদ)। মহানবী (স.) ই’তেকাফের জন্য সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগেই মসজিদে প্রবেশ করতেন। আর ফজরের নামাজ পড়ে ই’তেকাফের জন্য ঘেরা তাঁবুর মধ্যে প্রবেশ করতেন (ফতহুল বারী)। সুতরাং আমাদের সকল ই’তেকাফ পালনকারী ঈমানদার রোজাদারগণ যেন ই’তেকাফের উপরোক্ত সমস্ত করণীয় বর্জনীয় বিষয় মেনে চলে সঠিকভাবে ই’তেকাফ-এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন, আমীন।
