শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলাল মোহাম্মদের দেহদান

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৩, ২২:৪০
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসায় সিক্ত হলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সাক্ষী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও শব্দসেনা কবি বেলাল মোহাম্মদ। সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বললেন, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বেলাল মোহাম্মদের মত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে ম্যাজিস্ট্রেট অমিতাভ পরাগ তালুকদারের নেতৃত্বে একটি দল গতকাল বুধবার শহীদ মিনারে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনার প্রদান করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর তৃতীয় জানাজা শেষে শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মরদেহ মেডিক্যাল বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দান করা হয়। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এ নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমঘর থেকে বেলাল মোহাম্মদের মরদেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর দীর্ঘদিন কর্মস্থল বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ কার্যালয়ে। সেখানে দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সেখানে পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় তাঁর দ্বিতীয় জানাজা। এরপর তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সর্বস্তরের জনতার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তৃতীয়বার জানাজা শেষে এই মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বেলাল মোহাম্মদের ভাতিজি জামাই প্রকৌশলী কামাল আহমেদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর মরদেহ হস্তান্তর করেন। এই কৃতি সন্তানের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নিয়ে আসার পর সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্য ও তাঁর জন্মস্থান সন্দ্বীপের বাসিন্দা ছাড়াও তাঁকে একনজর দেখতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ভিড় জমায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসায় সিক্ত হন স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভাসিত মুহূর্তের বাতিঘর হিসেবে আলোদানকারী বেলাল মোহাম্মদ। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানেই প্রয়াতের স্মরণে খোলা হয় শোক বই। তাতে তাঁর নানা কীর্তি ও গৌরবের কথা লেখেন তাঁর সহকর্মী ও সুহূদরা। শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে এ কবিকে শেষ বিদায় জানান। গার্ড অব অনার প্রদান শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার মরদেহে পুষপমাল্য অর্পণ করেন একান্ত সচিব একেএম মনিরুল ইসলাম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের এ শব্দসেনাকে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, অসিম কুমার উকিল, স্বাস্থ্য সম্পাদক বদিউজ্জামান বাবলু প্রমুখ। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গণপূর্ত ও গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সংসদ সদস্য বেবী মওদুদ এ সময় মুক্তিযুদ্ধের এই সুহূদকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নেতা দিপঙ্কর সাহা দিপু ও জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়াসহ আরও অনেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ একাধিক রাজনৈতিক সংগঠন এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের মধ্যে কামাল লোহানী, তিমির নন্দী, ফকির আলমগীর, আশরাফুল আলম, সাইফুল আলম বাশার, বুলবুল মহলানবীশ, কল্যাণী ঘোষ, খায়রুল আলম সবুজ, কামালউদ্দিন, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ শিল্পীর মরদেহে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যক্তিদের মধ্যে নিভৃতচারী এই গুণী ব্যক্তিকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, প্রফেসর এমিরেটাস আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মনসুর মুসা, অধ্যাপক মাহফুজা খানম, শিক্ষা সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, সংস্কৃতি সচিব ড. রঞ্জিত কুমার বিশ্বাস, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, মফিদুল হক, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ডা. সারোয়ার আলী, এটিএম শামসুজ্জামান, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ডা. জাফরউল্ল¬াহ, ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, হাসান ইমাম, গোলাম কুদ্দুছ, হাসান আরিফ, কবি মোহাম্মদ সামাদ, অধ্যাপক ও অভিনেতা ড. এনামুল হক, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্র গোপ, কবি আসাদ মান্নান, কবি হালিম আজাদ, হাসান আরিফ, ঝুনা চৌধুরী, শংকর শাওজাল প্রমুখ। সন্দ্বীপের এই কৃতি সন্তানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে বসবাসরত সন্দ্বীপবাসীরাও আসেন শহীদ মিনারে। সন্দ্বীপ উন্নয়ন ফোরামের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক নূরুল আক্তার, মাহফুজুর রহমান মিতা, বায়রার সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার চৌধুরী, বেগম মুশতারী শফি প্রমুখ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া বেলাল মোহাম্মদের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্দ্বীপ হাই স্কুল, সন্দ্বীপ উন্নয়ন ফোরাম ও সন্দ্বীপ ড্রেস সার্কেল এসোসিয়েশনও শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিষদ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু একাডেমী, বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, খেলাঘর, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নাগরিক নাট্য সমপ্রদায়, ঋষিজ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক ফোরাম, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, ডিএফপি, জনতা ব্যাংক, গণ সমিতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, একুশে চেতনা পরিষদ, সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি, বাংলাদেশ পথ নাটক পরিষদ, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, বাংলাদেশ হিন্দু-খ্রীস্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সত্যেন সেন শিল্পী সংস্থা, কুশন দূর্গাপুর সমিতি, কিশলয়, চট্টগ্রাম সমিতি, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল প্রাকটিশিয়ান্স এসোসিয়েশন, চ্যানেল ২৪, টইটুম্বর ম্যাগাজিন, রাইজিং বিডি ডট কমসহ আরও অনেক সংগঠন পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে ‘জয়বাংলা, বাংলার জয়, হবে হবে নিশ্চয়...’ গানটি পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা। এর পরেই উপস্থিত সবাই তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধাস্বরূপ দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করেন। বেলাল মোহাম্মদ প্রসঙ্গে কামাল লোহানী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী প্রত্যেক মানুষ তাঁকে আজীবন মনে রাখবে। হাসান ইমাম বলেন, বেলাল মোহাম্মদ যা বিশ্বাস করতেন তার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষণা পাল্টে দেয়ার জন্য তাঁকে যেমন প্রলোভন দেয়া হয়েছিল, তেমনি চাপও প্রয়োগ করা হয়েছিল। তিনি এতটাই দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন যে, কোন প্রলোভন বা চাপ তাঁকে দমাতে পারেনি। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, বেলাল মোহাম্মদের মত কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেছিল বলেই একটি জাতি সপরিচয়ে উদ্ভাসিত হতে পেরেছিল। তিনি জাতির সেই উদ্ভাসিত মুহূর্তে বাতিঘরের মত কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটি মানুষের কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বাতিঘরের মতই ছিল। এই বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। তিনি আরো বলেন, বেলাল মোহাম্মদ জীবদ্দশায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দেখে যেতে পারেননি। আমরা তাকে কথা দিচ্ছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কোন মহলই বানচাল করতে পারবে না। এফডিসির মহাপরিচালক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি সারাজীবন বাঙালির চেতনা ধারণ করে গেছেন। দেশ গঠনে তিনি যে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, তাতে জাতি তাঁকে সারাজীবন স্মরণ রাখবে।