আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটকে বিজয়ী করা হলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষর মুক্ত সুখী-সমৃদ্ধশালী মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। গতকাল বুধবার পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি জামায়াত হেফাজতকে নিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, যারা ইসলামের নামে ধোঁকাবাজি করে, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে যাবে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠবে। হত্যা, খুন, ধর্ষণ বেড়ে যাবে। তিনি ২০০৮ সালে পীরগঞ্জ থেকে তাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য উপস্থিত জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দিয়ে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলে কৃষি উপকরণ দেয়া হয়েছে। মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা অবৈতনিক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার ছেলে জয়ের কাছে আমি কম্পিউটার ও ডিজিটাল বিষয়ক ধারণা নিয়ে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্য-প্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিয়েছি। ইউনিয়ন পর্যন্ত তথ্য সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। কমিউনিটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করার কারণে এখন চিকিত্সা-সেবা পেতে কাউকে আর ধরনা দিতে হয় না। আমরা ক্ষমতায় আসার পর গত সাড়ে ৪ বছরে দেশকে খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ করেছি। এখন একজন দিনমজুর যা আয় করে তা দিয়ে ৮/১০ কেজি চাল ক্রয় করা যায়। বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে ছিল। মানুষ ঠিকভাবে ২ কেজি চাল কিনতে পারতো না। তিনি আরো বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণ করার ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি নেত্রী ও তার দলের লোকজন বিদেশে টাকা পাচার করেছে। তারা উন্নয়ন নয়, লুটপাট করতেই ক্ষমতায় আসে। তারা ক্ষমতায় এলে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে। জনগণকে তারা দিতে নয় শুধুই নিতে আসে। তারা ক্ষমতায় থাকতে দেশ সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই দুর্নাম ঘুচিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি জামায়াত এবং হেফাজতকে নিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে। শত শত কোরআন শরীফ পুড়িয়েছে এবং বোমা হামলা চালিয়েছে। আজ মসজিদে ঠিকভাবে আজান হচ্ছে, তারাবীর নামাজ হচ্ছে। অথচ একটা সময় ছিল তা সম্ভব হতো না। মসজিদে গিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেছে, ঈমাম-মুয়াজ্জিনকে হত্যা করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ। যারা মসজিদে বসে মিথ্যা কথা বলে তারা সত্যিকারের মুসলমান হতে পারে না।
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার পর রংপুরে বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও বেগম রোকেয়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। তিস্তা নদীর উপর তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণ, ধরলা সেতু নির্মাণ, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট ও ওপেন হার্ড ইউনিট চালু করেছি। এছাড়া রংপুর-দিনাজপুরবাসীর প্রাণের দাবি কাঁচদহ ঘাটে করতোয়া নদীর উপর প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া সেতুর উদ্বোধন, পীরগঞ্জ উপজেলায় নবনির্মিত জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ও অফিসার্স ডরমেটরি ভবন উদ্বোধন, সার্কিট হাউজ এনেক্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বিভাগীয় কমিশনার কমপ্লেক্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, পীরগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মেরিন একাডেমি ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও পীরগঞ্জ পৌরসভা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছি।
মুই ফির আসিম:জয়
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র বিশিষ্ট কম্পিউটার বিজ্ঞানী সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ধানের শীষে ভোট দিলে দেশের উন্নয়ন বন্ধ হবে, মঙ্গা ফিরে আসবে, মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। তাই আজ ওয়াদা করেন মহাজোটকে ভোট দিবেন। তাহলে মহাজোট উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখতে পারবে। জয় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় ‘মুই ফির আসিম’ (আমি আবার আসবো) বলে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, এর আগে আমি রংপুরের পীরগঞ্জে এসে বেশকিছু উন্নয়নের ওয়াদা করেছিলাম। সে অনুযায়ী রংপুরে বিভাগ হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। অন্যান্য ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। পীরগঞ্জের উন্নয়ন করা হবে বলেছিলাম, তা করা হয়েছে। বিগত সরকার যা করেনি আমরা তা করেছি।
তিনি আরো বলেন, রংপুরের পীরগঞ্জকে আমি ভালোবাসি। এখানে এলে বার বার বাবার কথা মনে পড়ে। আমার বাবা যেভাবে এ এলাকাকে ভালোবাসতো, আমিও সেভাবেই আমার জন্মভূমিকে ভালোবাসি। আমি বিদেশে থাকলেও আমার মন সব সময় দেশে ও পীরগঞ্জে পড়ে থাকতো। পীরগঞ্জে এসে এর আগে আমি ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেছিলাম। সেই পীরগঞ্জ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের শুরু হয়েছে। আমার স্বপ্ন গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। সারাদেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইউনিয়ন তথ্য সেবা চালু করা হয়েছে। এখন সারাদেশে সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। মানুষ এখন ডিজিটাল তথ্য কেন্দ্র থেকে সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে উত্তরবঙ্গের কোন উন্নয়ন হয়নি। তারা উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের কথা ভুলে গিয়েছিল। তাদের আমলে উত্তরবঙ্গে মঙ্গা হতো। মানুষ না খেয়ে মারা যেতো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উত্তরবঙ্গে কোন মঙ্গা হয়নি। মানুষ না খেয়ে মারা যায়নি। বিএনপিকে ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিলে উত্তরবঙ্গে আবার মঙ্গা হবে। সজীব ওয়াজেদ জয় তার বক্তব্য প্রদানকালে উপস্থিত সর্বস্তরের জনতা ব্যাপক করতালি ও হর্ষধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, তার স্ত্রী ক্রিস্টিনা ওয়াজেদকে স্বাগত জানাতে গোটা পীরগঞ্জে ডিজিটাল ব্যানারসহ বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়।
পীরগঞ্জবাসীর বাঙালি সংস্কৃতির আতিথিয়তায় মুগ্ধ হন ক্রিস্টিনা। জনসভা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে বসানো হয় ক্রিস্টিনাকে। জনসভা চলাকালে পুরো সময়টা ধরেই হাস্যোজ্জ্ব্বল ক্রিস্টিনা উপভোগ করেন নেতৃবৃন্দের বক্তব্য। সজীব ওয়াজেদ জয় যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন তিনি তার মোবাইল ফোনে তা ধারণ করেন এবং শাশুড়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও ছবি তিনি ধারণ করেন।
পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহারুল হক বাবলুর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, এইচএন আশিকুর রহমান এমপি, আব্দুল মান্নান এমপি, আবুল কালাম আজাদ এমপি, জাফর আলী এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন প্রমুখ।
গতকাল দুপুর সোয়া ১২টায় সজীব ওয়াজেদ জয় হেলিকপ্টারে করে পীরগঞ্জ আসেন। এর কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি হেলিকপ্টারে করে পীরগঞ্জে অবতরণ করেন। পীরগঞ্জে নেমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ফতেহপুরে ড. ওয়াজেদ মিয়ার বাসভবন জয় সদনে যান। জয় সদনে প্রবেশের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী বাড়ির পাশের একটি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেন। জয় সদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, জয়ের স্ত্রী ক্রিস্টিনা ওভার মায়া, শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মেয়ে আলিজা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় আড়াই ঘন্টা ড. ওয়াজেদ পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিবেশে সময় কাটান, কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় এলাকাবাসী ওই বাড়ির সামনে সমবেত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ক্রিস্টিনা ওভারমায়ার ও আলিজা বাইরে বের হয়ে উপস্থিত লোকজনকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রীসহ তার পরিবারের লোকজন প্রয়াত বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কবর জিয়ারত এবং যোহরের নামাজ আদায় করেন। জনসভাস্থল থেকেই তিনি টুকুরিয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীর কাঁচদহ ঘাটে নবনির্মিত ড. ওয়াজেদ মিয়া সেতু ও উপজেলা সদরে নবনির্মিত আধুনিক ডাক বাংলো, রংপুর বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস এবং নবঘোষিত পীরগঞ্জ পৌরসভার কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এছাড়াও তিনি উপজেলা সদরে ডিজিটাল উপজেলা পরিষদ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বড় আলমপুর ইউনিয়নের পাটগ্রাম এলাকায় মেরিন একাডেমীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, রংপুর সার্কিট হাউস এনেক্স ভবন, রংপুর অফিসার্স ডর্মেটরী ভবন, রংপুর টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট এবং রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কমপ্লেক্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
করতোয়া নদীর উপর ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সেতুর উদ্বোধন
দিনাজপুর অফিস জানায়, গতকাল বুধবার দুপুর ২টায় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর উপর নবনির্মিত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সেতুর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতুটি নির্মাণে রংপুর ও দিনাজপুরের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে উঠল।
