দেশজুড়ে সড়ক-মহাসড়কের বিরাট অংশেরই এখন করুণ দশা। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত। অভিযোগ রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের দুটি সংস্থাকে (সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) প্রতিবছর যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, তার যথাযথ ব্যবহার হয় না। প্রতি বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। চলতি বর্ষায় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে কাজ করানো হলেও তা খুব একটা কাজে আসেনি। এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী বলে খোদ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। খানা-খন্দে ভরা রাস্তার কারণে আসন্ন ঈদ মৌসুমে ঘরমুখো যাত্রীদের মারাত্মক দুর্ভোগের কবলে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করছেন সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত জুলাই মাসের গোড়ার দিকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ২১টি পরিদর্শক দল গঠন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কের অবস্থা দেখতে পাঠানো হয়। এলাকা ঘুরে এসে এসব পরিদর্শক দল সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরভুক্ত সড়ক অবকাঠামোর বিরাট অংশের দুর্দশার চিত্র উঠে আসে। সে অনুযায়ী বিপর্যস্ত রাস্তাগুলো ঈদের আগে দ্রুত মেরামতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে সওজ’র প্রকৌশলীদের মাঠে নামানো হয়। এখনও চলছে সেই মেরামত কাজ।
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনম্যান্ট বোর্ড এলাকা বাদে দেশের বাকি সমস্ত পাকা সড়কের মালিক মূলত সওজ অধিদপ্তর ও এলজিইডি। এসব সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, সেই তুলনায় বরাদ্দ থাকে অনেক কম। কিন্তু রক্ষণাবক্ষণের বরাদ্দ দেয়া অর্থের যদি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতো, তাহলে পরিস্থিতি এতো খারাপ হতো না। কার্যত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যয় হয় না। এই খাতের টাকা অনেক সময় ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভিন্ন খাতেও ব্যবহার করা হয়। বিশেষত:এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলের টাকা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
সমপ্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলজিইডির কাজের ক্ষেত্রে গড়ে ১০ শতাংশ অর্থ ভাগাভাগি হয়ে যায়। অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এলজিইডির বেশিরভাগ প্রকল্প এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজে এরচেয়েও অনেক বেশি অর্থ নয়-ছয় হয়। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সওজ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধেও।
অবশ্য সওজ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ) বিপুল চন্দ্র সাহা ইত্তেফাককে বলেন, ২০০৫ সালের আগে পর্যন্ত সওজ অধিদপ্তরের এক খাতের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অন্যখাতে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে সেন্ট্রাল ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম (সিএমএস) চালু হওয়ার পর থেকে এটা পুরোপুরি অসম্ভব। তিনি বলেন, মূল সমস্যা হলো প্রয়োজনের তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দই থাকে অনেক কম। সওজ অধিদপ্তরের আওতাধীন বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
দৃষ্টান্ত দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সওজ মালিকানাধীন সড়ক নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং আগের অর্থ-বছরে এই বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। তার মতে, চাহিদামাফিক অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো ওভারলে বা কার্পেটিং করা সম্ভব হতো। তাতে রাস্তাগুলো টেকসই হতো। কিন্তু অর্থের অপ্রতুলতায় সিলকোট দিয়ে মেরামত করা হয়, যা খুব বেশি টেকসই হয় না। এ কারণে বছর না ঘুরতেই আবার মেরামতের প্রয়োজন পড়ে।
জানা গেছে, দেশে সওজ অধিদপ্তরের আওতায় ২১ হাজার ৪৮১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এরমধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩ হাজার ৫৪৪ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ২৭৮ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক রয়েছে ১৩ হাজার ৬৫৯ কিলোমিটার। সওজ অধিদপ্তরের সড়কগুলোর মধ্যে ১৬ হাজার ৬৪৯ কিলোমিটার রাস্তা বিটুমিনাস কার্পেটিং করা।
ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আমিনুর রহমান লস্কর অবশ্য সড়ক-মহাসড়কের খারাপ অবস্থার বিষয়টি স্বীকার করতেই রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আপনারা কোথায় এতো খারাপ অবস্থা দেখলেন। যেটুকু খারাপ ছিল আমরা এরইমধ্যে ঠিক করে ফেলেছি।’ তিনি বলেন, ‘এই বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই আমাদেরকে পুরনো সড়ক ভবন ছেড়ে এসে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যেও আমরা ঈদ সামনে রেখে সবগুলো সড়ক-মহাসড়ক মেরামত করেছি।’
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় দেশে মোট সড়ক রয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার ২৫ কিলোমিটার। এরমধ্যে উপজেলা রোড ৩৭ হাজার ৭৭২ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সড়ক ৪৪ হাজার ৭৮০ কিলোমিটার, এ শ্রেণীর গ্রামীণ রাস্তা রয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯০৬ কিলোমিটার এবং বি শ্রেণীর গ্রামীণ রাস্তা ১ লাখ ৫৬৫ কিলোমিটার।
সংস্থাটির মাঠ পর্যায়ের একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, প্রধানত বিদেশি অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় গ্রামাঞ্চলে হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ তথা পাকাকরণের কাজ করলেও তহবিলের অভাবে এসব রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো হচ্ছে না। এ কারণে এলজিইডির নির্মিত ৮০ শতাংশ সড়কেরই অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তারা বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যেটুকু অর্থ বরাদ্দ থাকে, সেটারও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ নানাবিধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার অপব্যবহার হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, বরাদ্দকৃত অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ হয়তো আছে। কিন্তু বরাদ্দের অপ্রতুলতার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জানান, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এলজিইডির আওতাধীন সড়কসমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চাওয়া হয়েছিল ৪ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। অথচ বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই খাতে ৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ মেলে। অপ্রতুল বরাদ্দ দিয়ে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এলজিইডির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলবার মতো শক্ত কোনো গাইডলাইন না থাকায় সংস্থাটি মূলত ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। এখানে এক খাতের অর্থ অন্যখাতে ব্যয় করা রীতিমতো নিয়মে পরিণত হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বরাদ্দকৃত টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি কিনে সেগুলো বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যবহারের জন্য উপহার দেয়ার নিয়মও (!) এখানে প্রতিষ্ঠিত।
