দক্ষিণের যাত্রীরা ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চে

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪১
পূর্ব দিগন্তে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য উঁকি দেয়ার সাথে সাথেই প্যাডেল দুইটি ছড়িয়ে কীর্তণখোলার পানি কাটতে কাটতে টার্মিনালে এসে ভিড়তে থাকে ‘পিএস অস্ট্রিচ’। ঢাকা থেকে নিয়ে আসা যাত্রীদের এখানে নামিয়ে দিয়ে পুনরায় ময়ূরের মতো পেখম মেলে রওয়ানা হতো খুলনার উদ্দেশে। শুধু অস্ট্রিচ নয়, বৃটিশদের স্মৃতিবিজরিত পিএস মাহসুদ, পিএস টার্ন, পিএস লেপচা ও পিএস সেলা ঈদ-কোরবানিতে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীর কাছে নিরাপদ নৌ-যান হিসাবে পরিচিত ছিল। যৌবন হারানো এ স্টিমারগুলো ৭/৮ বছর আগেও বাসন্তী রংয়ের শাড়িপরা নারীর মতোই যাত্রী নিয়ে প্রতিদিন ভেসে বেড়াতো কীর্তণখোলা, বুড়িগঙ্গা, পশুর, সুগন্ধা, গাবখান, ধানসিঁড়ি- এমনকি প্রমত্তা মেঘনা নদীতে পাখা মেলে। এর আগে এ ৫ স্টিমারের সাথেই শহীদ বেলায়েত, শহীদ এমদাদুল হক, গাজী রকেটও চলতো এ রুটে। বৃটিশ সাম্রাজ্যের কলকাতার হলদিয়া বন্দর থেকে পদ্মার উজানে উত্তরমুখী হওয়ার সুযোগ না থাকলেও যাত্রী পরিবহনে অভিজ্ঞ এই স্টিমারগুলোর প্রতি ভরসা ছিল সাধারণ যাত্রী ও ভিআইপি পর্যটকদের। বয়সের ভারে যৌবন হারানো এ স্টিমারগুলোর যাত্রাপথ সংকুচিত হয়েছে। মাত্র ৪ বছর আগেও এদের যাত্রাপথ ছিল রাজধানী ঢাকা থেকে শিল্পনগরী খুলনা পর্যন্ত। এখন যাত্রাপথ সীমিত মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত। যাত্রাপথ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি নাজুক জাহাজের বহরে যুক্ত হয়েছিল রেলওয়ে থেকে ক্রয়কৃত এমভি সোনারগাঁও। ঈদে গত বছরও ৬টি রকেট স্টিমার স্পেশাল সার্ভিসে যুক্ত করা হয়েছিল। অধিকাংশ জাহাজ ঢাকা-বরিশালের মধ্যেই যুক্ত রাখা হয়। সোনারগাঁও বিকল হওয়ার পাশাপাশি আরো একটি জাহাজ বরিশাল ঘাটে প্যাডেল ভেঙ্গে বিকল হয়েছিল। সংস্থার অচল জাহাজ হিসাবে পরিচিত সেলাকে রাখা হয়েছিল চাদপুর-বরিশাল রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যৌবন হারানো জাহাজগুলো ধীরে ধীরে যাত্রীদের আস্থা হারিয়েছে। কালের বিবর্তনে হলদিয়া, আসামের পর খুলনা ও চট্টগ্রাম থেকে নৌ-পথে রকেট স্টিমারে বরিশালে যাতায়াতের কথা ভুলতে বসেছে নদীবেষ্টিত দখিনের মানুষ। যত্রতত্র বিকল হওয়া পুরনো এ রকেট স্টিমারের প্রতি ভরসা নেই যাত্রীদের। ঈদের মাত্র এক সপ্তাহ বাকি থাকতেও স্পেশাল সার্ভিস ঘোষণা করতে পারেনি বিআইডব্লিউটিসি। যদিও সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তার দাবি- সকল জাহাজ মেরামত করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এবারও স্পেশাল সার্ভিস তারা ঘোষণা করবেন। বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গঙ্গার পূর্বগামী মোহনায় যে ১২টি প্রধান দ্বীপ জন্ম নিয়েছিল তার মধ্যে বরিশাল একটি। বরিশালের সাথে জন্ম নেয়া দ্বীপগুলোর মধ্যে বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, কুষ্টিয়া, খুলনা ও যশোরের লোকজন নৌপথে যাতায়াত করতো। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াতের জন্য বৃটিশদের এই স্টিমারগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নৌ-পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় গুটিয়ে যায় নৌযানের সার্ভিস। চরম অযত্ন আর অবহেলায় সরকারি সংস্থার অধীনে থাকা এ স্টিমারগুলোও যাত্রীদের আস্থা হারায়। শান্ত গতিতে চলাচলকারী বৃটিশদের তৈরি এ স্টিমারগুলো কয়েক বছর আগেও সরকারি আমলা এবং পর্যটকদের কাছে খুবই প্রিয় ছিল। চরম অযত্ন আর অবহেলার শিকার স্টিমারগুলো এক যুগ আগে থেকেই যেখানে সেখানে যাত্রীবোঝাই অবস্থায় বিকল হতে শুরু করে। ঈদ উপলক্ষে ঢাকা-বরিশাল-মোরেলগঞ্জ ও চাদপুর রুটে যে ৪টি স্টিমার সার্ভিসে দেয়ার দাবি করছে বিআইডব্লিউটিসি তার মধ্যে পিএস মাসুদ ৩ মাস নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে থাকার পর গত সোমবার সদরঘাটে আসার কথা থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ থেকে ফেরেনি। বরিশালে ২৩ জুলাই বিকল হয় পিএস অস্ট্রিচ। ঢাকা থেকে প্রকৌশলী পাঠিয়ে তা মেরামতের চেষ্টা চলছে। সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা নিত্যদিনই বলছেন—আজই ঠিক হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিআইডব্লিউটিসির এজিএম গোপাল কৃঞ্চ মজুমদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি একই ভাবে জানান, আজ বুধবার ঠিক হতে পারে। অস্ট্রিচের আগের দিন লেপচা পিরোজপুরে বিকল হয়ে পড়লে তা মেরামত করে ২৭ জুলাই সার্ভিসে যুক্ত করা হয়। সংস্থার সর্ববৃহত্ জলযান এমভি সোনারগাঁও আর সার্ভিসে ফিরে আসা কোন সম্ভবনা নেই। বর্তমানে সার্ভিসে থাকা ৩টি জাহাজের মধ্যে এমভি সেলার অবস্থা খুবই করুন। সরকারি জাহাজের এ বেহালের কারণে কদর বেড়েছে বেসরকারি কোম্পানির যাত্রীবাহী লঞ্চের। লঞ্চগুলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় চলাচল করতে পারে না। অথচ ৩নং সতর্ক সংকেত থাকলেও বিআইডব্লিউটিসির রকেট স্টিমার অনায়াসে চলাচল করতে সক্ষম। বৃটিশ আমলে প্রমত্তা গঙ্গা, মেঘনা ও পদ্মা যখন উত্তাল ছিল তখন এ স্টিমারগুলো যাত্রী নিয়ে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছতো। গত ৪২ বছরে এ স্টীমারগুলোর দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার নজির নেই। এত নিরাপদ নৌযান থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ঈদ-কোরবানিতে বেসরকারি কোম্পানির লক্কড় মার্কা লঞ্চে উঠতে বাধ্য হয়।