তিন ডাক্তার গ্রেফতার

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৬
মূল পরিকল্পনাকারী হচ্ছেন যুবলীগ নেতা চঞ্চল নেপালে বসে তিনি হত্যা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন তিনদিন আগে মিল্কীকে হত্যা করতে তারেককে নির্দেশ দেন চঞ্চল। মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন যুবলীগের (উত্তর) সাংগঠনিক সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল। মিলকীকে গুলি করেন মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সম্পাদক এসএম জাহিদ সিদ্দিক তারেক ও তার বডিগার্ড সোহেল। হত্যার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে তারেক ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে মিলকীকে গুলি করছেন। এদিকে তারেক নিহত হওয়ায় রহস্যটি অমীমাংসিত রয়েই গেছে তিনি আসলে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। নেপালে বসেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন চঞ্চল। হত্যাকাণ্ডের তিনদিন আগে তিনি ঢাকায় ফেরেন। ওইদিনই গুলশান এলাকায় বসে কিভাবে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে চঞ্চল বৈঠক করেন তারেকসহ কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে। ৬ ঘন্টার বৈঠকে আঁকা হয় হত্যার ছক। সেই অনুযায়ী গত সোমবার রাত সোয়া ১টায় গুলশান-১ সুপারস ওয়ার্ল্ডের প্রবেশ গেটে মিলকীকে হত্যা করা হয়। এ সময় তারেক গুলিবিদ্ধ হয়। তার দেহে অস্ত্রোপচার ও চিকিত্সা সেবা প্রদানকারী তিন ডাক্তারকে র্যাব গ্রেফতার করেছে। অপর এক ডাক্তার পলাতক রয়েছেন। এদিকে গত বুধবার রাতে খিলক্ষেতে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে যুবলীগ নেতা তারেক ও তার সহযোগী শাহ আলম নিহত হন। যুবলীগ নেতা মিলকীকে সুপারস ওয়ার্ল্ডের প্রবেশ গেটে বাম হাতে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে তারেক গুলি করেছে। সেই দৃশ্য বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশবাসী দেখেছেন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকারসহ বিভিন্ন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তারেক ও চঞ্চলের বডিগার্ড সোহেলও মিলকীকে গুলি করে হত্যায় সাহায্য করেছে। তারেকের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা ও টুপি। সোহেলের পরনে ছিল সাদা জিন্সপ্যান্ট। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গুলি করে তারেক। পরে সোহেল দুই রাউন্ড গুলি করে মিলকীর হত্যা নিশ্চিত করেছে। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তারেক মিলকী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন এবং কারা জড়িত ও কি কারণে তাকে হত্যা করা হয় পুরা কাহিনী বলে যায়। তবে তারেক ও তার সহযোগী নিহত হওয়ার পর একটি বিষয় অজানাই থেকে যায়। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তারেক স্বীকার করেছেন যে, তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে মিলকীকে গুলি করেছেন। অপরপ্রান্তে কার সঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন বিষয়টি র্যাব আড়াল করছে কিনা এনিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। গুলি করে হত্যার বিষয়টি সম্ভবত তারেক মোবাইল ফোনে তার গডফাদারকে শুনাচ্ছিলেন। গতকাল পর্যন্ত র্যাব এ রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। আর এই রহস্য উদঘাটন করতে না পারলে র্যাবের এ বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। যে কারণে মিলকীকে হত্যা যুবলীগ ও র্যাব সূত্রে জানা যায় যে, মিলকীর হাত ধরে তারেকের উত্থান। মতিঝিল এজিবি কলোনীতে মিলকীর হাত ধরে তারেকের ক্যাডার হিসেবে আবির্ভাব। এরপর ধীরে ধীরে যুবলীগের গ্রুপিং রাজনীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে তারেক জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মিলকীর সঙ্গে পাল্লা দেন তারেক। মিলকী যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রুপের এবং তারেক যুবলীগ নেতা আরিফ গ্রুপের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধান, ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (সিএমএমইউ), জেলা পরিষদ, ডিসিসি, সড়ক ও জনপথের টেন্ডারবাজি নিয়ে মিলকীর সঙ্গে তারেকের বিরোধ। সেই বিরোধ যুবলীগের বিভিন্ন নেতাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। কোটি কোটি টাকার ভাগাভাগি নিয়ে যুবলীগে স্থানীয় পর্যায়ের গ্রুপিং শেষ পর্যন্ত গড়ায় শীর্ষ পর্যায়ে। তারা কোটি কোটি টাকার ভাগ চায়। এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। টেন্ডারবাজি নিয়েও চঞ্চলের সঙ্গে মিলকীর বিরোধ রয়েছে। এছাড়া এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তারেক ও মিলকীর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে তাদের। সর্বশেষ মিলকী ও তারেক ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচনে দুইজনই প্রার্থী হতে চায়। এরমধ্যে স্থানীয় অপর এক নেতা যার হাত ধরে মিলকী ও তারেকের পথচলা। তিনি এক সময় তাদের গডফাদার ছিলেন। তারেক ও মিলকীর বিরোধ ওই নেতা কাজে লাগাতে সচেষ্ট হন। মিলকীকে তারেক হত্যা করার পর দুইজন এলাকা শূন্য হয়ে পড়বে। তার সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ঐ নেতা ৩৩নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী। তারেক ও মিলকী থাকলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না। মিলকী হত্যা করার পিছনে তার হাত ছিল। র্যাব এমন তথ্য প্রমাণ পেয়েছে। টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য এবং সর্বশেষ ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে দ্বন্দ্বে মিলকীকে হত্যা করা হয়। তারেকের ভগ্নিপতি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকায় তার দোর্দন্ড প্রভাব। মিলকী হত্যাকাণ্ডে তারেকের ভগ্নিপতি জড়িত বলে র্যাব সন্দেহ করছে। নিহত তারেক ও পলাতক চঞ্চল, তারেকের ভগ্নিপতিসহ মহানগরীতে যুবলীগের প্রায় একডজন ওয়ার্ড পর্যায়ে ও মহানগর কমিটি পদ পায় নিম্নে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকায়। এরা পদ কিনেছে চাঁদাবাজির জন্য এবং দলের জন্য নয় বলে তদন্তকারি কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য পেয়েছেন। শুধু যুবলীগে গ্রুপিং, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি হচ্ছে তা নয়, চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে যুবদলের মধ্যে অনুরূপ অবস্থা ছিল। যেভাবে তিন ডাক্তার গ্রেফতার ঘটনার সময় তারেক গুলিবিদ্ধ হন। তিনি প্রথমে মগবাজার রাশমনো হাসপাতালে যান। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়। সেখান থেকে তাকে নেয়া হয় উত্তরার জসীম উদ্দীন রোডের ফরচুন হাসপাতালে। তারেকের বন্ধু ডা. পাপ্পুর পরামর্শে তাকে নেয়া হয় ওই হাসপাতালে। ফরচুনের ডা. রানা পাপ্পুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রাত দুইটায় ফরচুন হাসপাতালে তারেকের অস্ত্রোপচার করেন ডা. কাওসার, ডা. রানা, ডা. রিয়াশাদ ও ডা.পাপ্পু। তারা তার শরীর থেকে একটি বুলেট বের করেন। ওই বুলেটটি ডা. পাপ্পু তার কাছে রেখে দেন। মঙ্গলবার ভোররাতে র্যাব ফরচুন হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তারেককে গ্রেফতার করে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিকে চিকিত্সা দেয়া ও বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানানোর কারণে র্যাব ডা. কাওসার, ডা. রানা ও ডা. রিয়াশাদকে গ্রেফতার করে। ডা. পাপ্পু এখনো পলাতক। রাশমনো থেকে ফরচুন হাসপাতালে স্থানান্তরসহ যাবতীয় সহযোগিতা করেন অ্যাডভান্সড হোল্ডিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। তারেক এই প্রতিষ্ঠানের এমডি। ফরচুন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আয়শা জামান জানান, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় র্যাব হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় তারেককে হাসপাতাল থেকে গাড়িতে করে নিয়ে যায়। তবে তাকে ওই সময় সুস্থই মনে হচ্ছিল। বিষয়টি কেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাননি এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালের পরিচালক ( অর্থ) ডা. ফজলে রাব্বীর ছোট ভাই ডা. রানার বিরোধিতার কারণেই বিষয়টি জানাতে পারিনি।