যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের আগে আরো রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই রাজপথে বিক্ষোভের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। যে কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে নিহত হয়েছে অন্তত ১৫০ জন। আহত হয়েছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু দেশটির সরকার সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীর বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে চলতি বছর রাজপথে আরও অনেক রক্ত ঝরবে। এদিকে, ব্রিটিশ পত্রিকা ফাইনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরো রক্তক্ষয়ী হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত কয়েক মাসে রাজপথে অনেকের প্রাণহানির পর আগামী জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আরো হিংসাত্মক পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা।
সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজপথে বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা-সম্পর্কিত ৪৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার এইচআরডব্লিউ’র ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়। ‘রক্তাক্ত রাজপথ: বাংলাদেশে বিক্ষোভকালে ব্যাপক বল প্রয়োগ’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন তৈরিতে ৯৫ জনের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের জন্য পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়েছে। নির্মম ও বেআইনিভাবে তাঁদের মারধর করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, রায়ের পক্ষে ও বিপক্ষে বিক্ষোভ ও সহিংসতা, মে মাসের শুরুর দিকে, হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কর্মসূচি, বিক্ষোভকারী ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের গ্রেফতার ভীতি প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর বলপ্রয়োগ বন্ধে সরকারসহ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সংস্থাটির সুপারিশের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে বলা হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়কে কেন্দ্র করে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল, সহিংসতা ও বিক্ষোভ হয়। ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে জামায়াতের বেশ কিছু বিক্ষোভকারী নিহত হন। আরেকটি রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটে ৫ ও ৬ মে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। এইচআরডব্লিউর এশীয় অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামসের আশঙ্কা, জাতীয় নির্বাচন ও যুদ্ধাপরাধীদের আরও রায় সামনে রেখে রাজপথে বিক্ষোভ বাড়তে পারে।
এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম টানতে সরকার ব্যবস্থা না নিলে রাজপথে আরো রক্ত ঝরবে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বল প্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালা অনুসরণে নির্দেশ দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সহিংসতা ও অরাজকতার একটি দুষ্ট চক্র বাংলাদেশে জড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা করছে এইচআরডব্লিউ। এ পরিস্থিতি এড়াতে সমাবেশ করা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারগুলোর নিশ্চিত করতেও আহবান জানিয়েছে তারা। এছাড়া নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে অভিযুক্ত করারও আহবান জানানো হয়েছে।
