আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে ইসি

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫০
‘জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা’ সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে জামায়াত ইস্যুতে ধীরগতিতে এগুতে চায় কমিশন। হাইকোর্টের রায়ের কপি পাওয়ার পর কমিশন সভায় উত্থাপন করে আইনী বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখবে ইসি। কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র আরো বলেছে, ২০০৮ সালে জামায়াতকে শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন দেয়া হয়। তাদের গঠনতন্ত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বেশ কয়েকটি ধারা পাওয়া যায়। এরপরেও নানা কারণে তাদের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে কমিশনকে অপেক্ষা করতে হবে। তবে গতকাল শেরেবাংলা নগরে অফিস ত্যাগের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে আদালতের দেয়া রায় পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদালতের দেয়া রায়ের কপি দ্রুত সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হবে। এদিকে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াতে ইসলামী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া কেউ আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ইসির এক নির্ভরশীল ব্যক্তি ইত্তেফাককে জানান, রাজনৈতিক বিতর্কমুক্ত থাকতে জামায়াত ইস্যুতে ধীরগতিতে আইনী দিকগুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। হাইকোর্টের রায়ের কপি দেখে সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত আবার পরিবর্তন করা লাগতে পারে। কারণ দলটি হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে। এজন্য আপিল বিভাগের রায় না পাওয়া পর্যন্ত কমিশন অপেক্ষা করবে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ২০০৮ সাল থেকে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে নির্বাচন কমিশন। ওই সময় ১১৭টি দল আবেদন করে এবং পরে খসড়া গঠনতন্ত্র জমা দিয়ে ৩৯টি দল নিবন্ধিত হয়। সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা না দেয়ায় ফ্রীডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল। গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর বিধান অনুযায়ী বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। হাইকোর্টের রায়ের পর তাত্ক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, কমিশন সভায় জামায়াত সম্পর্কে রায়ে আদালত যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে ইসি। তবে সম্ভবত নিবন্ধন নেয়ার সময় দলটির জমা দেয়া গঠনতন্ত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ধারার কারণে নিবন্ধন অবৈধ হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে আদালত রায় দিয়েছে। আমরা শুনেছি। স্বল্প সময়ের মধ্যে কপি সংগ্রহের চেষ্টা করবো। রায়ে আদালত কি বলেছে তা কমিশনে আলোচনা করে যতদ্রুত সম্ভব (অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল) দলটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। ইসি নিবন্ধন দিয়েছে এবং আদালত নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে-এর বিরুদ্ধে আপনারা আপিল করবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবেও সিইসি বলেন, এক্ষেত্রে রায়ের কপি দেখে সিদ্ধান্ত। আর নির্বাচনে দলটির অংশ নেয়ার বিষয়েও রায় দেখে ব্যবস্থা। এর আগে রায়ের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আপিল করেছে জামায়াতে ইসলামী। তিনি বলেন, আদালত রায় দিয়েছে। সেটা পালন করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যতদ্রুত সম্ভব দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নিবন্ধন ছাড়া সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোন দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। কারণ অনিবন্ধিত দল নিবন্ধিত দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে আইনে বাধা আছে। তবে নিবন্ধন অবৈধ হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনযোগ্য যেকোন ব্যক্তি চাইলে আগামী দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। জামায়াতের দুইজন সদস্য সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন সে অবস্থায় একটি দলের নিবন্ধন বাতিল হলে ইসি কি ধরনের পদক্ষেপ নিবে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, সবকিছুই বিবেচনা করছে আদালতের রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ওপর। রায়ের কপি পর্যালোচনা করে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন পায় জামায়াত নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৮টি দলের সবক’টিই ২০০৮ সালে ছায়া গঠনতন্ত্র বা অননুমোদিত গঠনতন্ত্র জমা দিয়ে নিবন্ধন পেয়েছিল। তখন শর্ত ছিল, নির্বাচনের পর দলগুলো জাতীয় সম্মেলনে ছায়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করিয়ে তা কমিশনে জমা দেবে। ২০১০ সালের মধ্যে দলগুলো অনুমোদিত গঠনতন্ত্র কমিশনে জমা দেয়। কমিশন কয়েক দফায় এসব গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে। পরে বেশ কয়েকটি দলের গঠনতন্ত্রে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অন্যতম। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন পায় জামায়াতে ইসলামী। তবে ওই সময়ে জামায়াত যে গঠনতন্ত্র জমা দেয় তাতে বেশকিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে যে ত্রুটি জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ২ (৫) ধারায় বলা হয়-‘আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজস্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না, কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না এবং আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁহার দেয়া আইন পালনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, এমন সকল আইন আনুগত্য মানিয়া লইতে অস্বীকার করিবে। কেননা স্বীয় সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকার আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও নাই।’ এছাড়া গঠনতন্ত্রের ভূমিকার শেষ অংশে বলা হয়-‘মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল।’ তিনবার কমিশন থেকে বলা হয়েছিল-এই অংশটুকু সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই ২০০৮ সালে নিবন্ধিত হতে জামায়াত যে ছায়া গঠনতন্ত্র জমা দেয়, তা থেকে ২ (৫) ধারা ও ভূমিকার শেষ অংশ বাদ দেয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালের নভেম্বরে জামায়াত গঠনতন্ত্র পুনর্মুদ্রণ করে। তাতে উল্লিখিত ভূমিকা ও ৫ (২) ধারা বহাল রাখা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসলামের শাসন কায়েমের ধর্মীয় উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) পরিপন্থী মোট ৮টি ধারা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে দলটি।