জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের ওপর আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন বাতিল হলেও রাজনীতি করার অধিকার হারাবে না জামায়াত। তারা সভা-সমাবেশ করতে পারবে। জামায়াতের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা নেই। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক বলেন, এ রায়ে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি। শর্তপূরণ করে জামায়াত নতুন করে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ রায় দিয়ে হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশন জামায়াতকে নিবন্ধন দিয়েছিল। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি যে নিবন্ধন দিয়েছিল এ রায়ের মধ্যদিয়ে ইসির অক্ষমতাকেই প্রকাশ করা হয়েছে। ইসি দলের গঠনতন্ত্র দেখে নিবন্ধন দেয়। এ নিবন্ধনের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে রাজনৈতিক বিষয় আদালতে টেনে আনা অনভিপ্রেত।
নির্বাচন কমিশনের কৌসুলি এডভোকেট মহসীন রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। বলেছে ইসির দেয়া নিবন্ধন আইন সিদ্ধ নয়। তবে হাইকোর্ট রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতকে সরাসরি আপিল দায়েরের অনুমতি দিয়েছে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রায়ের উপর স্থগিতাদেশ না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত দলটির নিবন্ধন বাতিল বলে গণ্য হবে। ফলে এই মুহূর্তে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। তবে রায় স্থগিত হলে নিবন্ধনটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
মহসীন রশীদ বলেন, এ রায়ের ফলে জামায়াত মার্কা (দাড়িপাল্লা) নিয়ে নির্বাচন করার অধিকার হারালো। অর্থাত্ একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা আইনে রয়েছে (প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া, টিভি/রেডিওতে বিতর্কের সুযোগ, আর্থিক হিসাব বিবরণী দাখিল) সেগুলোর অধিকার হারাবে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তিনি বলেন, জামায়াত নাম নিয়ে দলটি সভা-সমাবেশ করতে পারবে। নিবন্ধিত হতে হবে এমন কোন কথা নেই। গণজাগরণ মঞ্চ তো স্মারকলিপি দিচ্ছে। মহসীন রশীদ বলেন, নিবন্ধন নিতে হলে জামায়াত ইসলামীকে নতুন করে নির্বাচন কমিশনে আবেদন দাখিল করতে হবে। সেটি দলটির বর্তমান নামেই করতে পারবে। অর্থাত্ আমাদের বুঝতে হবে যে নিবন্ধন চলে গেছে, দলটির নাম নয়।
জামায়াতের প্রধান কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ রায় ন্যায়ভ্রষ্ট। ভুল রায়। তিনজন বিচারপতি একমত হয়ে রায় দিতে পারেননি। এটা বিভক্ত রায়। এ রায় জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তারা সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে আইনগত বিষয় জড়িত থাকায় আমাদের সরাসরি আপিল করার অনুমতি দিয়েছেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, এ রায়ের ফলে জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না তা বলা যাবে না। কারণ এটা এখন বিচারাধীন বিষয়। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছি। এ আপিলের ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সকলকেই অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট প্যান্ডোরার বক্স খুলে দিয়েছে। যিনি রিট আবেদন করেছেন, তিনি হাইকোর্টে খোলা মনে আসেননি। কারণ জনস্বার্থের মামলায় হাইকোর্টে আসতে হলে খোলা মন নিয়ে আসতে হয়। রিট আবেদনকারী তরিকত ফেড়ারেশনের নেতা। আবেদনকারীর রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে জেহাদের কথা উল্লেখ আছে। যার গঠনতন্ত্রে জিহাদের কথা উল্লেখ আছে, তিনি জামায়াতের গঠনতন্ত্র চ্যালেঞ্জ করে রিট করতে পারেন না। এ রিট অপরিপক্ব। এ রায় আইনের রায় আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও সংবিধানের পরিপন্থী।
অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেন, হাইকোর্টের দেয়া রায় কার্যকর হলে রাজনীতিতে ধর্মে অপব্যবহার বন্ধ হবে এবং দলটি আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনকে রায় অনুসারে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে গেজেট প্রকাশ করতে হবে। তিনি বলেন, এ রায় জনগণের প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। সংবিধানের ১১২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ রায় মানা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এমকে রহমান বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত যে আপিল করেছে, আপিল বিভাগ যদি হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে তাহলে আর কোন দিনই দাড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে এবং জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ব্যানারে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
অন্যতম রীট আবেদনকারী সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান বলেন, এ রায়ে আমরা খুশি। অনেক পরে হলেও আজ জনগণ প্রত্যাশিত রায় পেয়েছে। হাইকোর্টের দেয়া এ রায়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকারীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হল। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি, যাদের কারণে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করতে এসেছিলো এদেশের মাটিতে তারা নিষিদ্ধ হবে এটাই আমাদের দাবি।
