সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২১:১২
সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে আগামী দিনগুলোতে গোটা পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সড়ক দিয়ে যদি যানবাহনই চলতে না পারে, তাহলে এমন সড়ক রেখে লাভ কী? সকলেরই জানা— বর্ষাকালে আমাদের সড়কগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়ে। এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। আবহমান বাংলারই চিত্র এটি। আমরা গত বর্ষায়ও দেখেছি, এই বর্ষায়ও দেখছি—বর্ষার শুরুতেই সড়কগুলো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এর জন্য মূলত দায়ী সড়কগুলোর উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নিম্নমানের সংস্কার ও নির্মাণ কাজ এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজের সমন্বয়হীনতা। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরও এ পর্যন্ত সারা দেশের জেলা সড়কগুলোর ৭ হাজার ৬০ কিলোমিটার রাস্তা জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আঞ্চলিক হাইওয়ের ১২১টি সড়কের ৩ হাজার ৩শ’ ৩৪ কিলোমিটার ও ৭১টি জাতীয় মহাসড়কের ২ হাজার ৮শ’ ১ কিলোমিটার সড়কের অবস্থাও শোচনীয়। স্বাভাবিক গতিতে এসব সড়ক যাত্রী ও মাল পরিবহণসহ অন্যান্য যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশার বিস্তারিত তথ্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে চলতি বছর সংস্কারের জন্য ৭ হাজার ৯১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করলেও পাস হওয়া বাজেটে মোট ৫ হাজার ৫শ’ ৫১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোপূর্বে জরুরিভিত্তিতে আপত্কালীন সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের জন্য ৩ হাজার ৯শ’ ৭১ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। অবশ্য তখনই বলা হয়েছিল, বর্ষা শুরুর আগে আগেই জরুরিভিত্তিতে মেরামত করতে না পারলে মেরামতের খরচ অনেকগুণ বেড়ে যাবে। ভুলে যাওয়ার কথা নয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই যোগাযোগমন্ত্রী জোর গলায় বলেছিলেন, বর্ষার আগেই সড়ক-মহাসড়কগুলো যান চলাচলের উপযোগী হবে। জনগণের দুশ্চিন্তার কোনো কারণই থাকবে না। পর্যবেক্ষকমহল মনে করছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগখাত বিশেষ করে সড়ক-মহাসড়কের চলতি ও জরুরি প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করাই ছিল অপরিহার্য। আমাদের দেশে একদিকে সড়ক মেরামত করা হচ্ছে, অন্যদিকে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি—এমন চিত্রও নতুন কিছু নয়। খোঁড়াখুঁড়ি যার কাজ, তিনি খুঁড়ে রেখে ফেলে যান কিংবা কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে চলে যান। রাজধানীর সড়কগুলোর দিকে নজর দিলে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। এর ফলে সড়কগুলো দ্রুত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। উড়াল সেতু বানাতে গিয়ে ঢাকার সায়েদাবাদে সড়কের যে করুণ দশা তৈরি করে রাখা হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। অথচ এ সড়কটি দেশের পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার প্রবেশপথ। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথের অধীনে সারা দেশে ৮শ’ ৩৩টি জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে। কাগজে-কলমে সড়ক-মহাসড়ক ও জেলাগুলোর সড়কগুলোর দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ৪শ’ ৫০ কিলোমিটার উল্লেখ করা হলেও কার্যত রয়েছে ২০ হাজার ৫০ কিলোমিটার। প্রতি বছরই সড়ক-মহাসড়ক মেরামতে জরুরিভিত্তিতে কাজের কথা বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল আমলা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা মিলে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করে নিয়ে অপচয়ের একটি ভুয়া হিসাব দেখানো হয়ে থাকে। গত অর্থবছরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে এ খাতে ৯শ’ ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করে ২ হাজার ৮শ’ কিলোমিটার রাস্তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জোর গলায় বলা হলেও কাজের মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছিল। সারা দেশের ৪ হাজার ৯শ’ ২৯ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ২শ’ ৯৬ কিলোমিটার রাস্তা একেবারেই যান চলাচলের অনুপযোগী। এসব রাস্তার ওপরের অংশ ভেঙে ফেলে নতুন করে তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৬২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৮০ কিলোমিটার আঞ্চলিক ও ১শ’ ৫২ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। সড়ক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ৫ হাজার কিলোমিটার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এর মধ্যে ১৫০০ কিলোমিটারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই এসব সড়কে যানবাহন চলাচল করছে। এর বাইরে আরো ৩শ’ কিলোমিটার সড়ক একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। এগুলোর অবস্থা এতোই খারাপ যে, মেরামত করেও যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা আদৌ সম্ভব নয়। এসব সড়ক সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করতে হবে। এছাড়াও ৮ হাজার কিলোমিটার সড়কে গর্ত ও ফাটল রয়েছে। আগের ও বর্তমান সার্ভে অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল ও খুলনার সড়ক-মহাসড়কগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ। এই অবস্থায় টানাবর্ষণ, নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধিতে সারা দেশে বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। ইতোপূর্বে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে বন্যা বারবার হানা দিয়েছে। এখন উত্তরাঞ্চলে ভারতীয় পাহাড়ি ঢল-বন্যা আর নদ-নদীর বন্যার পানিতে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। সঙ্গত কারণেই আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে বন্যা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। বন্যার পানির তোড়ে সারা দেশে বিশেষ করে শহরতলী ও গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও সড়ক-মহাসড়কগুলোর অস্তিত্ব ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কের যে বিপর্যয়কর বাস্তবতা সে আলোকে সরকারের বাজেট বরাদ্দ, সেইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের তার সুষ্ঠু ব্যবহার বেশি প্রয়োজন। দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়লে তার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। ভবিষ্যতের বৃহত্ প্রকল্প নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত হওয়ার আগে জনস্বার্থে বিরাজমান যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। সরকার মেয়াদের শেষ বাজেট হিসাবে জনদুর্ভোগ লাঘবে ও জনকল্যাণে সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর দ্রুত উন্নয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সচেষ্ট হবেন বলে আশা করি। ঢাকা