খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে আইন ও প্রয়োগ

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২১:১৩
মন্ত্রিসভা নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছেন। এ আইনে খাদ্যে ভেজালের জন্য দুই বছর থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে কেউ একই অপরাধ দুবার করলে তাকে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিকল্প শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে আরেকটি আইন প্রণয়নের অনুমতিও দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত এ আইনের আওতায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য উত্পাদন ও বিপণন করা যাবে, তবে তার বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া শিশুখাদ্য উত্পাদন, বিপণন ও এ সংক্রান্ত উপকরণ আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে খাদ্যসংক্রান্ত দুটি আইনের অনুমোদন অবশ্যই একটি ভালো পদক্ষেপ। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত খাদ্যপণ্যে অবাধে মেশানো হয় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ফরমালিন। ভয়ংকর ক্ষতিকর এ রাসায়নিক অবাধে মেশানো হচ্ছে মাছ, দুধ, ফলমূল ও সবজির সঙ্গে। মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি বিঘ্নিতকারী এ রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যত কোনো উদ্যোগ ফলপ্রসূ হচ্ছে না। মাছে ও দুধে ফরমালিন, ফলমূলে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল, সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, জিলাপি-চানাচুরে মোবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংকস, জুস, সেমাই, আচার, নুডলস এবং মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রঙ, মুড়িতে ইউরিয়া-হাইড্রোজ, পানিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই। ভেজাল খাবার খেয়ে আমরা ক্রমেই মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি, নতুন প্রজন্মকে মেধাহীন পঙ্গু জীবনের মতো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। শুধু খাদ্যপণ্য নয়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, হারবাল ওষুধ এমনকি স্যালাইনও বাদ পড়ছে না। নকলের দাপটে এখন আসল পণ্য চেনাই দায় হয়ে পড়েছে। খাদ্যপণ্যে নকল-ভেজালের দৌরাত্ম্য ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত খাদ্যপণ্যে ফরমালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তা রোধ করার জন্য কড়া আইনের প্রয়োজন ছিল। তবে যথোপযুক্ত আইন হলেই খাদ্যে ভেজাল কমবে কিংবা দেশবাসী এ আপদের কবল থেকে মুক্তি পাবে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত বিচারও নিশ্চিত করা দরকার। শুধু বিক্রেতাকে শাস্তি দিলে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ হবে না। খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করতে এর মূলে হাত দিতে হবে। ধরতে হবে আসল অপরাধীদের যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায়। খাদ্যে ভেজালকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে কেউ এ ধরনের কাজ করতে সাহস না পায়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। খাদ্যে ভেজালের কারণে কিডনি ও পাকস্থলিসহ শরীর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা খুবই লজ্জাজনক যে, এত বড় দেশে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মাত্র ৫৬৫ জন। এ সংখ্যা আরো বাড়ানো উচিত। শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে খাদ্যে স্থায়ীভাবে ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি করা ও তাদের কাজে লাগানো। আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রি করার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও এ পর্যন্ত তা প্রয়োগের তেমন কোনো নজির নেই। ভেজালবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ যেমন আশা করা যাবে, তেমনি ভেজালের হোতারাও পালাতে বাধ্য হবে। ব্রিটিশ আমল থেকেই আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা চলে এলেও বর্তমানে তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন সরকার ও বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে কাজ করা। প্রকৃতি কোন ফল বা ফসলটি কোন সময় জোগান দেয় এবং সেগুলোর প্রকৃত রঙ ও ধরন কী রকম সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব সরকারের। ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিগণ ও গণমাধ্যম জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষায় আইনের ঘাটতি না থাকলেও তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, তাদের অসততা ও অবহেলা সবকিছু পয়মাল করে দিচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস ভেজালকারীদের আগ্রাসন থামাতে সরকার শুধু আইন তৈরিই নয়, অপরাধীদের নিবৃত্ত করতে তার প্রয়োগও নিশ্চিত করবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে আইন প্রণয়নই শুধু নয়, এ ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তোলারও উদ্যোগ নিতে হবে। যারা খাদ্যপণ্যে কেমিক্যাল মিশিয়ে ভোক্তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে তা এলাকাবাসীর অজানা নয়। তাদের আইনের হাতে তুলে দেওয়ার জনসচেতনতা গড়ে উঠলে সমাজ থেকে ভেজালকারীদের উচ্ছেদ সহজেই সম্ভব হবে। খাদ্যে ভেজালকারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন শুধু প্রণয়ন নয়— চাই কার্যকরী উদ্যোগ। ঢাকা