দর্শক-বান্ধব নয় ঢাকা চিড়িয়াখানা

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৮
অবকাঠামো পরিবেশ খাঁচার বিন্যাস কিছুই মানসম্মত নয় সদস্য হতে পারেনি আন্তর্জাতিক সংস্থার কিউরেটর বললেন, আধুনিকায়নের উদ্যোগ মাত্র নেয়া হচ্ছে রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঢাকা চিড়িয়াখানা এখনও সবার শীর্ষে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীতে আসা বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ বিশেষত শিশুদের প্রধান আকর্ষণ এই চিড়িয়াখানা। প্রতিবারই ঈদের ছুটিতে চিড়িয়াখানায় দর্শকদের ঢল নামে। বছরে ৪০ লাখের বেশি দর্শক সমাগম এখানে। কিন্তু দর্শকপ্রিয়তায় শীর্ষে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক পরিবেশ, প্রাণী বৈচিত্র্য ও সুযোগ-সুবিধা এখনও দর্শকবান্ধব নয়। আর দর্শকবান্ধব না হওয়ায় ওয়ার্ল্ড এসোসিয়েশন অব জু এ্যান্ড এ্যাকুরিয়ামস (ওয়াজা) এর সদস্যও হতে পারেনি ১৯৭৪ সালে রাজধানীর মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা চিড়িয়াখানা। ওয়াজার সদস্য হতে পারেনি চিড়িয়াখানার অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে ওয়ার্ল্ড এসোসিয়েশন অব জু এন্ড এ্যাকুরিয়ামস (ওয়াজা) এর সদস্য হতে পারেনি বাংলাদেশ। এ কারণে আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানটি। ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার অভিযোগ, ঢাকা চিড়িয়াখানার অবকাঠামো অবস্থা, খাঁচার বিন্যাস ও পরিবেশসহ কোনকিছুই মান-উপযোগী নয়। এ কারণে ঢাকা চিড়িয়াখানাকে সদস্য করেনি এই সংস্থাটি। আর সংস্থার সদস্য না হওয়ায় বৈধ পথে পশু-পাখি আনতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ওয়াজা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না ঢাকা চিড়িয়াখানার কোন কর্মকর্তাকে। এ বিষয়ে কিউরেটর ডা. এনায়েত হোসেন বলেন, চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এই আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ওয়াজার সদস্য হওয়া যাবে। দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সংকট আনা যাচ্ছে না প্রাণী দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে বিদেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রাণী আনা যাচ্ছে না। সর্বশেষ প্রাণী আনার জন্য ৪ বার দরপত্র আহবান করা হয়। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়নি। চিড়িয়াখানার প্রাণী ও পাখি আনার জন্য কোন আন্তর্জাতিক দরপত্র গ্রহণ করা হয় না। আর দেশের মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানি করে। এর মধ্যে ‘ফ্যালকন’ ইতিপূর্বে দরপত্রের নিয়ম ভেঙেছে। যথাসময়ে প্রাণী আমদানি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে ওই প্রতিষ্ঠানটি আর দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না। বাকি রইলো একটি। চিড়িয়াখানার কর্মকর্তা শামীম হোসেন বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিও প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে ততটা সক্ষম নয়। এ কারণে বিপাকে পড়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। গত ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৭০টি প্রাণী ও পাখি আনার জন্য ছয় কোটি ৯৫ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ ছিল। কিন্তু দরদাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে ১১টি প্রজাতির ২৩টি প্রাণী এবং ১৫ প্রজাতির ১৬৭টি প্রাণী সব মিলে মাত্র ১৯০টি প্রাণী ও পাখি আনা হয়। বাকিগুলো আনা হয়নি। চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর মাকসুদুল হাসান হাওলাদার বলেন, এই সমস্যা উত্তোরণ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। অপ্রতুল চিকিত্সা ব্যবস্থা জনবলও কম চিড়িয়াখানার প্রাণী ও পাখির জন্য চিকিত্সা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি পাস করে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে এন্ট্রি লেভেলের এক কর্মকর্তা এখানে চিকিত্সা বিভাগের প্রধান হন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিভিএম শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে গৃহপালিত পশু-পাখির চিকিত্সা পদ্ধতি সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। বন্যপ্রাণী সম্পর্কে শুধু পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে কিছুটা জানার সুযোগ থাকে। কিন্তু এই বিভাগে পাস একজন শিক্ষার্থীর চাকরির শুরুতে চিড়িয়াখানার মতো স্পর্শকাতর এলাকার চিকিত্সার দায়িত্বে দেয়া হচ্ছে। তার নেই বন্যপ্রাণীসহ অন্যান্য ভিনদেশি প্রাণীর চিকিত্সার বাস্তব অভিজ্ঞতা। নেই বিদেশে কোন প্রশিক্ষণ। এ বিষয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে এসে পশু ডাক্তাররা দেখে দেখে শেখেন। ওয়াজার সদস্য না হতে পারায় উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া যাচ্ছে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যারা চিড়িয়াখানায় পশু চিকিত্সক বা অন্যান্য পদে চাকরি করেন তাদের বন্যপ্রাণীর ওপর বিশেষ কোর্স করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটি হচ্ছে না। পশু-পাখির রোগ নির্ধারণে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এখানে চিকিত্সাসেবার নামে কিছুই হচ্ছে না। চিকিত্সকের প্রশিক্ষণের অভাব এবং পশু চিকিত্সকের স্বল্পতার কারণে চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আর এ কারণে প্রতিনিয়ত পশু-পাখি অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। চিড়িয়াখানায় বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর ১১ জন ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণীর ২৮ জন এবং চতুর্থ শ্রেণীর ১৭০ জন কর্মচারী রয়েছেন। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে, এ জনবল ১৯৭৪ সালের কিন্তু বর্তমান সময়ের জন্য এ জনবল খুবই কম। নেই জু এ্যাক্ট ঢাকা চিড়িয়াখানায় আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া প্রাণীদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। যেগুলো খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে সেগুলোকে অভ্যন্তরীণ হাসপাতালে রাখা হয়। অন্য দেশে বার্ধক্যগ্রস্ত প্রাণীদের মেরে ফেলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ্যাক্ট না থাকায় এ ধরনের কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আবদ্ধ খাঁচায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় তাদের। এ বিষয়ে বৃহত্ প্রাণী শাখা প্রধান বলেন, জলহস্তীর অনেক বয়স। এই প্রাণীটিকে অন্য কোথাও রাখা উচিত। কিন্তু অন্য কোথাও রাখার কোন জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে খাঁচার ভিতরেই রাখতে হচ্ছে। যত সমস্যা প্রাণী সংরক্ষণ, প্রাণী কল্যাণ, গবেষণা, শিক্ষা ও বিনোদন-এই পাঁচটি উদ্দেশ্যে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা হলেও একটি উদ্দেশ্যও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। পর্যাপ্ত খাদ্য, বসবাসের পরিবেশ ও চিকিত্সার অভাবে প্রাণীগুলোর শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। ১৯৭৪ সালে পুরনো আদলে সাজানো চিড়িয়াখানায় নেই যেমন পরিবেশের বৈচিত্র্য, নেই প্রাণীবৈচিত্র্য। সরেজমিনে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের চলাচলের রাস্তাও পরিচ্ছন্ন নয়। পশু-পাখির শেডের আশ-পাশে ঘিরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। পশু-পাখির কিছু কিছু শেড অকেজো হয়ে আছে। মেরামতের উদ্যোগ নেই। দর্শকদের জন্য যে পাবলিক টয়লেট রয়েছে তা নোংরা এবং ব্যবহারের অযোগ্য। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শিশু পার্ক। কিন্তু সেখানে অকেজো কিছু বিনোদনসামগ্রী রয়েছে। ব্যবহার উপযোগী কোন উপকরণ নেই। পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন। পার্কের ভেতরে বসার বেঞ্চগুলো নোংরা আর খাঁচার প্রাণীগুলোকে দেখা গেছে নিস্তেজ। কোন সাড়াশব্দ নেই। কোন কোন খাঁচায় প্রাণী বা পাখি নেই। কোন কোন প্রাণীর খাঁচার বাইরে নির্দেশিকা বোর্ড রয়েছে। আবার অনেক প্রাণীর খাঁচার বাইরে কোন নির্দেশিকা বোর্ডই নেই। নির্দেশিকা বোর্ডে ওই প্রাণী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকার কথা। কোন কোন বোর্ডের লেখা উঠে গেছে। প্রাণীর খাঁচার কাছাকাছি কোন নিরাপত্তা প্রহরী বা দায়িত্বরতদের কারও দেখা মেলা ভার। এ বিষয়ে বৃহত্ প্রাণী (তৃণভোজী) শাখার প্রধান শামীম হোসেন বলেন, পুরনো ও অকেজো হয়ে যাওয়ায় কিছু খাঁচা ব্যবহার করা হচ্ছে না। পুষ্টিবিজ্ঞানী কারা:চিড়িয়াখানায় বিভিন্ন ঠিকাদারদের কাছ থেকে খাবার বুঝে নেয়ার একটি কমিটি থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে খাবারের মান নির্ধারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ঢাকা চিড়িয়াখানায় চোখে দেখে খাবার মান নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বলেন, এখানে উন্নত কোন যন্ত্রপাতি না থাকায় এমনটি করতে হচ্ছে। চোখে দেখেই অনেক খাবারের মান নিশ্চিত করা সম্ভব। খাবারে কার্বাইড আছে কিনা পরীক্ষার কোন উপায় নেই। সম্ভাবনা:ঢাকা জাতীয় চিড়িয়াখানা ও রংপুর চিড়িয়াখানাকে বিশ্বমানের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য প্রায় ৩৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি প্রতিনিধিদল এ কাজের জন্য ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলোকে আপন পরিবেশে চলতে দিতে সৃষ্টি করা হবে। এর মাধ্যমে প্রাণীগুলো পাবে উন্মুক্ত পরিবেশ। খাঁচাবন্দি প্রাণীরা অনেকটাই বন্য পরিবেশ পাবে। রংপুর চিড়িয়াখানার পরিবেশও পরিবর্তন করা হবে। তথ্য অনুযায়ী, চিড়িয়াখানার পশু-পাখির খাঁচাকে সম্পূর্ণ বন্য আবহে তৈরি করতে একজন জাপানি জু-আর্কিটেক এবং একজন জু-কনসাল্টেন্টের সহায়তা নেয়া হবে। প্রচলিত খাঁচাকে বদলে আধা প্রাকৃতিক, প্রাণীবান্ধব ও তিনস্তরের নিরাপত্তা বলয়বিশিষ্ট খাঁচা তৈরি করা হবে। চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পে ঢাকা চিড়িয়াখানার ১৮৬ একর জমিকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হবে। ঢাকা চিড়িয়াখানার বর্তমান অবকাঠামো পরিবর্তন করে দর্শকদের জন্য একমুখী রাস্তা তৈরি করা হবে। শিশুপার্ক, সুরক্ষা দেয়াল, দিকনির্দেশক, সব শ্রেণীর মানুষের সহজে যাতায়াতের জন্য সিঁড়ি, দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা (ফুটপাত এবং পার্কে ছাউনি এবং ছাউনি ছাড়া), রেলিং, সড়ক দ্বীপ, রোড ডিভাইডার ও বিভিন্ন গাছের পাত্র, রাস্তায় এবং বাগানে আলোর ব্যবস্থা, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, দর্শকদের জন্য আলাদা রাস্তা (একমুখী) এবং দেয়াল ও বনায়ন (ভূ-প্রাকৃতিক), গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা এবং থাকবে শব্দহীন গাড়ি। এই শব্দহীন গাড়িতে চড়ে পুরো চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলো দেখা যাবে। চিড়িয়াখানার ইতিহাস: ১৯৪৭ সালে ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে একটি চিড়িয়াখানা স্থাপনের প্রয়োজন হয়। পঞ্চাশের দশকে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে সীমিতভাবে হাতি, চিত্রা হরিণ, বানরসহ কয়েকটি প্রজাতির বন্যপ্রাণী নিয়ে ঢাকা চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু হয়। মিরপুর এলাকায় ১৯৬০ সালে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। ১৯৬১ সালে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হয়। প্রাণীদের বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, হাইকোর্ট সংলগ্ন চিড়িয়াখানা হতে বন্যপ্রাণী স্থানান্তর ও দেশ-বিদেশের প্রাণী সংগ্রহের পর ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন জনসাধারণের জন্য বর্তমান চিড়িয়াখানা উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে স্তন্যপায়ী ৫৩ প্রজাতির ৪৪৭টি, সাপের ১১ প্রজাতির ৬১টি, পাখি ১২১ প্রজাতির ৯৯২টি। এছাড়া ২৩ প্রজাতির ৭৯৭টি মাছ রয়েছে।