দেশকে দু:স্বপ্নের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন দেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারি মালিকানায় নেয়া বা ১৯ টুকরো করার কথা শুনলে ব্যাপারটাকে দু:স্বপ্নের মতো মনে হয়। এটা চিন্তাও করা যায় না। গ্রামীণ ব্যাংক গরিব মানুষের ব্যাংক। গরিবের হক অন্যকেউ নিয়ে নেবে, এটা সহ্য করা যায় না। যে কোনো ব্যক্তি বা দলের যত আক্রোশই থাকুক না কেন, দেশের মানুষ যে কোনো কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে এই ব্যাংক রক্ষা করবে।
গতকাল গণসংবর্ধনায় দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ‘কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল’ প্রাপ্তির জন্য রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে তাকে এই সংবর্ধনা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তী আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন)।
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নাগরিক সংবর্ধনা কমিটি’র ব্যানারে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, কলামিস্ট সাদেক খান, বুদ্ধিজীবী ড. পিয়াস করিম, আইনজীবী ড. তুহিন মালিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমদ, সাবেক সচিব মনিরুজ্জামান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) মঞ্জুর কাদের প্রমুখ। তবে ড. ইউনূস ছাড়া অন্যকেউ বক্তৃতা করেননি। নোবেল বিজয়ীকে একটি ক্রেস্ট ও মানপত্র দেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে ফুল দিয়ে অভিনন্দিত করা হয় এই বরেণ্য অর্থনীতিবিদকে।
সংবর্ধনার জবাবে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটা আমার নয়, গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লাখ গরিব নারীর পাওয়ার কথা। এই অর্জন এবং সম্মান তাদেরই। কিন্তু যে ব্যাংক দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে, দেশের গরিব নারীদের সাবলম্বী করেছে, সেই ব্যাংকের প্রতি কেন এত আক্রোশ বুঝতে পারছি না। ব্যাংকটিকে পুনর্গঠনের জন্য এর আগে সরকার একটি কমিশন করেছে। সেই কমিশন গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারের মালিকানায় নেয়ার কথা বলছে। তিনি বলেন, আবার বলা হচ্ছে ব্যাংকটিকে ভেঙ্গে ১৯ টুকরা করা হবে। এখন কারো কোনো অভিযোগ ছাড়াই সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের চেষ্টা করছে। কী এক অদ্ভূত সিদ্ধান্ত! গ্রামীণ ব্যাংক তো কোনো সরকারি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নয়। এটা ব্যক্তি উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান। সব পেশাজীবী সংগঠনে সরকার যদি এভাবে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিতে শুরু করে তাহলে দেশের কী অবস্থা হবে ? আমরা দেখছি যে, দেশের নির্বাচন কমিশন নিয়ে কি অবস্থা চলছে। জাতীয় নির্বাচনের ঠেলাই সামলাতে পারছে না। এখন গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচন নিয়ে সরকার আলাদা নির্বাচন কমিশন করার কথা বলছে।
তিনি বলেন, সরকারের গঠিত কমিশন গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯ টুকরা করার কথা বলেছে। তারা এখনও থামেনি। যে কোনো সময় নাকি তারা সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে। অথচ কমিশনের এমন চিন্তার বিরোধিতা করে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা কি জেগে আছি না দুঃস্বপ্ন দেখছি ? এই দুঃস্বপ্নের শেষ কোথায় ? যে রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শই হোক কিংবা ব্যক্তি আক্রোশ বা প্রতিহিংসা থাকুক না কেন গ্রামীণ ব্যাংক তার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।
নোবেলজয়ী এই ব্যক্তিত্ব গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্টির পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মহাজনী ঋণের দৌরাত্ম্য থেকে গরিব মানুষকে উদ্ধার করতেই একদিন এই ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম চালু করেছিলাম। নানা পথ-পরিক্রমায় এই কর্মসূচি পরিণত হয় সুবিশাল গ্রামীণ ব্যাংকে। দেখতে দেখতে এটি ৩৭ বছর পেরিয়েছে। এক/দেড় হাজার টাকার ঋণ দেয়া থেকে শুরু করে এখন প্রতি মাসে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক। সেই হিসেবে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হচ্ছে। এই টাকাও আসছে গ্রামের গরীব নারীদের কাছ থেকে। তারাই মালিক। আবার তারাই ঋণ নিয়ে সাবলম্বী হচ্ছে। বর্তমানে এ ৮৪ লাখ ঋণগ্রহীতার আট হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে এই ব্যাংকে। এই সম্পদ অর্জনে সরকার বা কোনো ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া হয়নি।
