বিদায় মাহে রমজান

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪১
আজ ২৪ রমজান। রসূল (স.) মহিমান্বিত রজনী বা লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করার জন্য যে পাঁচটি বেজোড় রাতের উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে আজকের দিবাগত পঁচিশের রাতটিও অন্যতম। যারা জীবনের পূর্বের সকল গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের দলভুক্ত হতে চান তাদের সকলেরই উচিত আজ রাতেও জাগরণ করে নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দো’য়া, তওবাহ-এস্তেগফার, বিভিন্ন তাসবীহ ও জিকির আজগারে অতিবাহিত করা। এর মধ্যে যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরপ্রাপ্ত হবেন তারা হাজার মাস অর্থাত্ ৮৩ বছর ৪ মাস একাধারে ইবাদতের সওয়াব লাভে ধন্য হবেন। সাথে সাথে আল্লাহতা’য়ালা ঐ ব্যক্তির মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করবেন। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা ইবনে আবী হাতেম (রহ.) বলেন, একবার রসূলুল্লাহ (স.) বনী ইসরাইলের চারজন সাধকের কথা বললেন। তাঁরা সুদীর্ঘ আশি বছর ধরে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করেছেন যে, ঐ সময় চোখের পলক মারার মত সময়ও তাঁরা আল্লাহর না-ফরমানী করেননি। তাঁরা হলেন আইয়ুব, যাকারিয়া, হিযকীল ইবনে আঁঁজুয ও ইউশা’ ইবনে নূন। কথাগুলো শুনে সাহাবায়ে কেরাম খুবই আশ্চর্যান্বিত হলেন। ফলে নবী (স.)-এর নিকট জিব্রাইল (আ.) এলেন এবং বললেন, আপনার উম্মত ঐ সমস্ত সাধকের আশি বছরের ইবাদতের কথা শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় হচ্ছে? তাই আল্লাহ তা’য়ালা এরচেয়েও কল্যাণকর জিনিস আপনাদের জন্য নাজিল করেছেন। তা হলো সূরা ক্বদর। যাতে বলা হয়েছে যে, লাইলাতুল ক্বদরে মাত্র একটি রাতের ইবাদত এক হাজার অর্থাত্ তিরাশি বছর চার মাসের ইবাদাতের চেয়েও উত্তম। এ সুসংবাদ শুনে রসূলুল্লাহ (স.) ও সহাবায়ে কেরাম খুবই খুশী হন (তাফসীর ইবনে কাসীর ৪র্থ খণ্ড ৫৩১ পৃ:, তাফসীর দূররে মনসুর ৬ষ্ঠ খণ্ড ৩৭১ পৃ:)। অন্য বর্ণনায় আছে, একদা নবীকে (স.) স্বপ্নে পূর্বেকার লোকদের আয়ু দেখানো হলো। তখন তিনি বুঝলেন যে, তাঁর উম্মতের আয়ু খুবই কম। সুতরাং তারা সারা জীবন কাজ করলেও ওদের আমলের নিকটেও পৌঁছতে পারবে না। তখন আল্লাহতা’য়ালা তাঁকে লাইলাতুল ক্বদর দান করেন, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম (মু’আত্তা মালিক ৯৯ পৃ: তাফসীর ফতহুল কাদীর ৫ম খণ্ড-৪৭২ পৃ:, তাফসীর কাবীর ৮ম খণ্ড-৪৪৪ পৃ:)। কথিত আছে, সুলাইমান (আ.) এবং যুলকারনাইন পাঁচশ’ মাস ধরে রাজত্ব করেছিলেন। তাদের ঐসব আমলকে আল্লাহতা’য়ালা ক্বদরে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য রেখে দিয়েছেন। আল্লাহতা’য়ালা আসমানসমূহ ও জমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টি জগতের তাকদীর বা ভাগ্যলিপি লিখে রেখেছেন (মুসলিম, মেশকাত ১৯ পৃ:)। তাছাড়া সূরা দুখানের ৪র্থ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: কুরআন নাজিলের বরকতময় রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, এ বছর থেকে আগামী বছর পর্যন্ত বৃষ্টি ও রুজী এবং আয়ু ও মৃত্যুর পরিমাণ যতটা হবে তা এই লাইলাতুল ক্বদরের রাতে নির্ধারণ করা হয়। অর্থাত্ পঞ্চাশ হাজার বছর আগে ‘লওহে মাহফুজে ’ যে ভাগ্যলিপি লেখা আছে তা থেকে উক্ত বিষয়গুলো এ রাতে ফেরেশতাদের লিপিবদ্ধ করিয়ে দেয়া হয়। সেজন্য এ রাতকে লাইলাতুল ক্বদর বা ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা হয় (তাফসীরে কাবীর ৮ম খণ্ড ৪৪৩ পৃ:)। যেসব ফেরেশতাকে উক্ত বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দেয়া হয় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উক্তি মোতাবেক তাঁরা হলেন চারজন- ইসরাফীল, মীকাঈল, জিব্রাইল ও আজরাইল (আ.) (তাফসীরে কুরতুবী, মা’আরিফুল কুরআন ৮ম খণ্ড-৭৯১-৭৯২ পৃ:)। আরবী ক্বদর শব্দের অর্থ কখনো কমানো, সংকীর্ণ ও অসচ্ছলও হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: ‘যার রুজী কমিয়ে দেয়া হয়েছে’ (সূরা তালাক ৬৫:৭ আয়াত)। অন্যত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: ‘তিনি যার জীবিকা কমিয়ে দেন (সূরা ফজর ৮৯:১৬ আয়াত)। এ আয়াতের ভিত্তিতে আরবী ভাষাবিদ্যার মহারথী আল্লামা খলীল (রহ.) বলেন, লাইলাতুল ক্বদরের রাতে অগণিত ফেরেশতা আকাশ থেকে নামার ফলে জমীন সংকীর্ণ হয়ে যায়। তাই ঐ রাতকে লাইলাতুল ক্বদর বা জমীন সংকীর্ণ হবার রাত বলা হয় (তাফসীর ফতহুল কাদীর ৫ম খণ্ড-৪৭২ পৃ:)। সুতরাং আজকের রাতে পার্থিব সকল ঝামেলামুক্ত হয়ে ই’তেকাফের মাধ্যমে আমরা ও আমাদের আহাল-পরিবার-পরিজন সকলে মিলে রাব্বুল আলামীনের ইবাদত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করে জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারি এবং জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি রাইয়ান নামক দরজার উত্তরাধিকারী হতে পারি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক দান করুন, আমীন। e-mail : [email protected]