বগুড়ার ৭টি আসনেই শুরু হয়ে গেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি। বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশিরা কাছের লোকদের নিয়ে কর্মকৌশল ঠিক করছেন। সেইসাথে দলের হাইকমান্ড যাতে পক্ষে থাকে সেজন্য নির্বাচনী এলাকায় নিজেদের ইমেজ এবং জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য দিনরাত কাজ করছেন। জানা গেছে, জেলার হারানো দুটি আসন পুনরুদ্ধারসহ সবকটি আসনে জয়লাভ করে পুনরায় বগুড়াকে নিজেদের দুর্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে বিএনপিকে রুখে দিয়ে সবকয়টি আসনে বিজয়ী হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান হওয়ায় ‘বিএনপির দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় বরাবরই বিএনপির জনসমর্থন আকাশচুম্বি। কিন্তু বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনে অদূরদর্শিতার খেসারত দিতে হয় দলটিকে। দু’টি আসন বগুড়া -১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) এবং বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) হারায় তারা। তবে বগুড়া-৬ (সদর) ও বগুড়া-৭ (গাবতলী -শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বরাবরের মতো বিজয়ী হন দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে তিনি আসন দু’টি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বগুড়া-৭ আসন থেকে এবং সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বগুড়া-৬ আসন থেকে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু অতিথি এই দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে এলাকার খোঁজ-খবর না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারও আসন দু’টিতে ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থী খালেদা জিয়া হবেন- এটা প্রায় নিশ্চিত। ফলে এ দু’টি আসনে ১৮ দলের কেউ মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন না। আর এই দুটি আসনের মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে বিগত নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন। তিনি এবার এ আসন থেকে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে এবার নতুন মুখের দেখা মিলবে।
জেলায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শরীক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্যদলগুলোর তেমন প্রভাব বা জনসমর্থন নেই। একই অবস্থা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটেও। একমাত্র জাতীয় পার্টির সামান্য জনসমর্থন রয়েছে, বাকি দলগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। অন্যদিকে সিপিবি, জাসদ এর মোটামুটি সাংগঠনিক কার্যক্রম রয়েছে। এ কারণে বগুড়ায় ১৮ দলীয় জোটের পাল্লাটা কাগজে-কলমে একটু ভারীই। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বও রয়েছে।
জানা গেছে, এখানে আওয়ামী লীগকে চলতে হয় কেবলমাত্র নিজেদের জনসমর্থনের উপর। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন না হওয়া, তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না হওয়াসহ সরকারের সহযোগি সংগঠনগুলোর কিছু নেতা-কর্মীর ভূমি দখল, হত্যা, সন্ত্রাস, নির্যাতন ক্ষমতাসীন দলটিকে কিছুটা হলেও ইমেজ সংকটে ফেলে দিয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি মমতাজ উদ্দিন এটা মানতে নারাজ। তার মতে, যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে , তারা কেউই আওয়ামী লীগের নয়। আর যারা এসব করেছে তারাও মূল দলের কেউ নয়। তিনি দলে অন্তর্দ্বন্দ্বের কথাও অস্বীকার করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘মূল দলে কোন দ্বন্দ্ব নেই । সহযোগি সংগঠনের নেতাদের দু’একজনের পদের লোভ থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে শিগগিরই সম্মেলন হবে। সম্মেলনে ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতা নির্বাচন হবে। তাছাড়া বাইরে কে কি বললো সেটা কোন বিষয় নয়?’ ভূমি দখল, সন্ত্রাস এসবের সাথে আওয়ামী লীগের কোন নেতা-কর্মী জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। একই সাথে আগামী নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে দল জয়লাভ করবে বলে দাবি করেন মমতাজ উদ্দিন।
এছাড়া গত নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেতা আর সদর আসনে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এবার বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তা না হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে দলের স্বার্থে জেলায় দলের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত এই নেতা দলের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করবেন বলে ইত্তেফাককে জানান। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে বগুড়ার ৫টি আসনে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের প্রার্থী জয়লাভ করবে। কারণ বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি নয়, আওয়ামী লীগের জনসমর্থন এ জেলায় বিএনপির চেয়ে অনেক বেশি।’
অপরদিকে গত সংসদ নির্বাচনে হারানো দুটি আসনসহ সবকটি আসন দলের পক্ষে নিতে জেলার বিএনপি নেতা-কর্মীরা ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছেন। যদিও দলের এক সময়ের ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভেদ রয়েছে। তথাপিও দলীয় স্বার্থে সব কোন্দল ভুলে আপাতত ঐক্যবদ্ধভাবে আটঘাট বেধে নেমেছেন ১৮ দলের নেতারা। এছাড়া সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত বগুড়া -৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, সাবেক হুইপ রেজাউল বারী ডিনা, সাবেক এমপি ডা. জিয়াউল হক মোল্লা দলে ফেরার চেষ্টা করছেন। তারা দলে ফিরলে বিশেষ করে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বগুড়া-৫ আসনের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় আসনটি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মতামত দিয়েছেন। এদিকে বগুড়াকে বিএনপির হাইকমান্ড আলাদা গুরুত্ব দিয়ে থাকে বরাবরই। জোট সরকারের সময় দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে বগুড়ায় উন্নয়ন হয়েছে অনেক বেশি। সেসময় তারেক রহমান নিজে বগুড়ার উন্নয়নের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানেও বিদেশ থেকে বগুড়ার সম্পর্কে সবসময় খোঁজ খবর অব্যাহত রেখেছেন তারেক। আগামী নির্বাচনে দল থেকে এ জেলার মনোনয়ন প্রত্যাশিরা তাই তারেক রহমানের ‘গুড বুকে’ থাকার সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
জেলা বিএনপির একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে বগুড়ার আসনগুলোতে বিএনপি যাদের মনোনয়ন দিবে তাদের সকলকেই অবশ্যই তারেক রহমানের চোখে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘অনেক বড় দল বিএনপি, নেতা-কর্মীর সংখ্যাও অনেক। দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দলীয় স্বার্থে জেলা বিএনপি এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।’ আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এবার ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থীরা মহাজোটের প্রার্থীদের অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করবে।’
সম্ভাব্য প্রার্থী যারা
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) :এই আসনে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান আবারো মহাজোট প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে । কেন্দ্র আপাতত এই আসনে নতুন কোন প্রার্থীর কথা ভাবছে না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখ্য, বিএনপি দলীয় প্রার্থীর নিকট পর পর তিনবার পরাজিত হওয়ার পর ৪র্থ বার ৯ম জাতীয় সংসদ নিবাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী শোকরানাকে পরাজিত করে আবদুল মান্নান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ।
এদিকে বিএনপি দলীয় তিনজন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এরা হলেন, গত নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও হোটেল ব্যবসায়ী শোকরানা, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান আহসান তৈয়ব জাকির। তবে এদরে মধ্যে শোকরানার নামই জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে ।
এদিকে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করলে এ আসনে সারিয়াকান্দি উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মোকছেদুল আলম প্রার্থী হতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ): এই আসনে ২০০৮ সালের আগের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। কিন্তু তিনি একবারও জয়লাভ করতে পারেননি। গতবারের নির্বাচনে মান্নার পরিবর্তে প্রথমে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন। পরে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শরিফুল ইসলাম জিন্ন্াহ্। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন এবার মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি ছাড়াও এবার মনোনয়ন চাইতে পারেন তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা তৌহিদুর রহমান মানিক। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচয় পাওয়া মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগে গুরুত্ব হারিয়ে গঠন করেছেন ‘নাগরিক ঐক্য’ । আগামী নির্বাচনে তিনি ‘নাগরিক ঐক্য’র প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রার্থী হবেন বলে আভাস পাওয়া গেছে ।
এদিকে এই আসনে বিএনপি থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান পুনরায় মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়া বিএনপির সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক হুইপ রেজাউল বারী ডিনা আবারও দলে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন । দলের মনোনয়ন প্রত্যাশাই তার দলে ফেরার অন্যতম কারণ বলে দলীয় সূত্র দাবি করেছে । এছাড়া ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মীর শাহে আলম ।
অন্যদিকে মহাজোটের ব্যানারে নির্বাচন হলে বিগত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জেলা জাপা সভাপতি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী। একক নির্বাচন হলেও তিনি প্রার্থী হবেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে ।
বগুড়া-৩ (আদমদীঘি - দুপচাঁচিয়া ) : এ আসনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্যসহ বিএনপির ৩, আওয়ামী লীগের ৩, জামায়াতের ১ ও স্বতন্ত্র ১ জন প্রার্থী মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন। বিএনপিতে গৃহ বিবাদ থাকলেও বর্তমান এমপি আব্দুল মোমিন তালুকদার খোকা দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থাকায় তাঁর অনুসারীরা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে এ আসনে খোকা ছাড়াও বিএনপি থেকে থানা বিএনপির সদস্য সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এর চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরী ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল দলীয় সমর্থন পেতে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আসনে আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট তবিবর রহমান তবি, আদমদীঘি উপজেলা সভাপতি লায়ন আনছার আলী মৃধা, সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম খান রাজু দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে নির্বাচনী মাঠে তত্পর রয়েছেন।
গত নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়লাভ করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও শুধুমাত্র গৃহ বিবাদের কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল ঘরে তোলা যায়নি। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা এবিএম শাহজাহান এর সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আনছার আলী মৃধা এ আসনে প্রায় ৮৮ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল মোমিন তালুকদার খোকা পেয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ভোট। আর মহাজোটের মনোনীত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মাওলা পান প্রায় ২৪ হাজার ভোট। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী আনছার আলী মৃধা দুই উপজেলাতেই দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিরঙ্কুশ সমর্থনের পাল্লা তাঁর দিকেই ভারী রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা এবিএম শাহজাহান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।
বগুড়া-৪ (কাহালু -নন্দীগ্রাম) : জেলার কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৪ আসন। ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বগুড়ার এ আসনটি বিএনপি’র দখলে রয়েছে। বর্তমান সংসদ সদস্য প্রকৌশলী জেড আই মোস্তফা আলী মুকুল আগে থেকেই মাঠে নেমে আছেন। এছাড়া জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি এডভোকেট রাফী পান্না এবং জেলা বিএনপি’র কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোশারফ হোসেনকে কাহালু-নন্দীগ্রাম এলাকায় সাধারণ মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে দেখা যাচ্ছে। তবে এ আসনে বিএনপি থেকে কে মনোনয়ন পাবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অপর দিকে বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের এড.ইউনুস আলী মন্ডলকে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে মহাজোট থেকে জেলা জাসদের সভাপতি রেজাউল করিম তানসেনকে মনোনয়ন দেয়া হলে নির্বাচনে তিনি চার দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী মোস্তফা আলী মুকুলের কাছে হেরে যান। তাই এখানে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে চরম ক্ষোভ ।
আগামী সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন: জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম দুদু এবং তার ভাতিজা নন্দীগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল আশরাফ জিন্নাহ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ইউনুছ আলী, কাহালু উপজেলা সভাপতি হেলাল উদ্দিন কবিরাজ প্রমুখ। এছাড়াও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জেলা জাসদ সভাপতি রেজাউল করিম তানসেন ।
এদিকে এক সময়ের জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কাহালু উপজেলায় এখন আর সে ঘাঁটি না থাকলেও তাদের তত্পরতা রয়েছে। জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী বলে থাকেন জামায়াতের ভোট ছাড়া এ আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করতে পারবে না। তাদের মাইনাস করলে বা তারা সরে আসলে বিএনপির ভরাডুবি নিশ্চিত। তারা আরোও জানান, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে কাহালু-নন্দীগ্রাম উপজেলা জামায়াত এ আসনে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা বিএনপিকে কোন ভাবেই ছাড় দিবে না। তারা এ আসনে তাদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জোর দাবি জানাবেন। দলের জেলা নায়েবে আমীর ও কাহালু উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা তায়েব আলী এ আসনে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রার্থী হবার জন্য এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন।
অপর দিকে ৪ বার নির্বাচনে অংশ নেয়া সাবেক সংসদ সদস্য ডাঃ জিয়াউল হক মোল্লার এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও সংস্কারপন্থী হওয়ায় বিগত নির্বাচনে বিএনপি তাকে মনোনয়ন দেয়নি। বর্তমানে তিনি দলে ফেরার চেষ্টা করছেন। তিনি দলে ফিরলে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন এমনটি প্রায় নিশ্চিত ।
এ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির সহ সভাপতি ও নন্দীগ্রাম উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হাজী নুরুল আমিন বাচ্চু, জেলা যুব সংহতির সভাপতি ফারুক আহমেদ ও জেলা জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক স্থানীয় দৈনিক উত্তরের খবর সম্পাদক আব্দুস সালাম বাবুও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে।
বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট): হারানো এই আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। আর যে কোন মূল্যে আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। জানা গেছে, ২০০৮ সালের আগে আর কোন নির্বাচনে এই আসনে জিততে পারেনি আওয়ামী লীগ। গতবার বিএনপির প্রার্থী জানে আলম খোকাকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হঠাত্ রাজনীতিতে আসা মহাজোট প্রার্থী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. হাবিবর রহমান।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান এমপি ছাড়াও রয়েছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও শেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মজিবর রহমান মজনু এবং সাবেক এমপি আমান উল্লাহ খান।
বিএনপি’র সূত্র জানায়, এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক শেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কে এম মাহবুবার রহমান হারেজ, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা জানে আলম খোকা, শেরপুর পৌসভার চেয়ারম্যান স্বাধীন কুমার কুন্ডু ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আনোয়ারুল ইসলাম শাহিন। এছাড়া সংস্কারপন্থী হিসেবে গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাবেক এমপি গোলাম মোহাম্মাদ সিরাজ দলে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী এ আসনে ব্যবসায়ী দবিবর রহমানকে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন।
জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক এমপি এড. শাজাহান আলী তালুকদার ও শেরপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস ভুঁইয়া প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে।
বগুড়া-৬ (সদর): এই আসনে বরাবরই নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া । এবারও তিনি এ আসনে ১৮ দলীয় জোটের একমাত্র প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা । আর গত নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন জেলা আ’লীগ সভাপতি মমতাজ উদ্দিন। এবার তিনি এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন না বলে ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছেন। ফলে এ আসন থেকে এবার মহাজোটের মনোনয়ন চাইতে পারেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু, সাংগঠনিক সম্পাদক টি জামান নিকেতা এবং জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাগর কুমার রায় ও বয়সে তরুণ যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম ডাবলু । আর জাতীয় পার্টি যদি এককভাবে নির্বাচন করে তাহলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম ওমর। এছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা ও জেলা জাপার সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট সাথী হান্নান দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে দলের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বগুড়া-৭ (গাবতলী ও শাজাহানপুর) : এ আসনেও ১৮ দলীয় জোটের সকলেই খালেদা জিয়ার পক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন । এখানে বিএনপির নেতৃত্ব দুটি গ্রুপে বিভক্ত হলেও নির্বাচনে দলীয় স্বার্থে গাটছড়া বেঁধে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির এডভোকেট আলতাফ আলী মনোনয়ন পেলেও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার কাছে হার মানেন। পরে উপ-নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হন আওয়ামী লীগ নেতা ডা. মোস্তফা আলম নান্নু। তিনিও অতিথি প্রার্থী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের কাছে ভোটযুদ্ধে পরাজিত হন। আগামী নির্বাচনে এই আসনটিতে ডা. নান্নু আবারও মনোনয়ন চাইবেন এটা অনেকটাই নিশ্চিত। এছাড়া সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি কামরুন্নাহার পুতুল, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ইমারত আলী ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রফি নেওয়াজ খান রবিন মহাজোটের মনোনয়ন চাইবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে ।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এককভাবে নির্বাচন করলে এডভোকেট আলতাফ আলী, লিয়াকত আলী সরকার ও লুত্ফর রহমান সরকার স্বপন দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে।
