গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা ও দায়ভার

আপডেট : ১৪ মে ২০১৯, ২১:৪৪

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্যের ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করেছে। এটি নিত্য ভোগান্তির স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অব্যবস্থাপনার ফলে অবর্ণনীয় কষ্টে পড়তে হচ্ছে দেশের প্রত্যেকটি নগরিকের নগর জীবন ব্যবস্থায়। এ সমস্যাটি রীতিমতো জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। ক্রমাগত ভাবিয়ে তুলছে সচেতন প্রায় সব মহলকে। পরিবহন ব্যবস্থার নানা দুর্ভোগ-নৈরাজ্য-অনিশ্চয়তা-অন্তহীন অপেক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখেই চরম বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করেই যাতায়াত করতে হচ্ছে হররোজ। ঘর থেকে বের হয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার কোনো নিশ্চয়তা নেই। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না থাকার কারণে সমস্যার উত্পাদন বেড়েই চলছে। ছাত্র-ছাত্রী চাকরিজীবী নারী-পুরুষ-শিশু এমনকি অসুস্থ রোগীও জীবন-মৃত্যুর খেলায় আপস করছে অনেক ক্ষেত্রে। রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে চলছে রীতিমতো চিটিং। ঢাকাসহ সারাদেশে বেশির ভাগ বাসেই বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা, যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, অপমান-অপদস্ত, ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। দেখার কেউ নেই, নীরব দর্শকের ন্যায় ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তারা লাগামহীনভাবে গলা কাটা ভাড়া নিয়ে ক্ষান্ত নয়। কোনো কোনো পরিবহনে হেলপার ও সুপারভাইজার যাত্রী উঠা ও নামানোর সময় কৌশলে নারী যাত্রীদের গায়ে হাত দিচ্ছে। প্রায় ৯৪ শতাংশ সিএনজি চলছে মিটারের বদলে চুক্তির মাধ্যমে। গণপরিবহন ব্যবস্থা উপেক্ষিত থাকার কারণে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রাইভেটকার,-এর সঙ্গে বাড়ছে পার্কিং সমস্যা। অভিজ্ঞজনের মতামত, নগরীর মাত্রা অতিরিক্ত প্রাইভেটকার বৃদ্ধির কারণে যানজট বেড়েই চলেছে। বিআরটিএ অনুমোদিত যে সিট রাখার কথা বলা হয়েছে তার বেশি রাখার ফলে সাধারণ যাত্রীদের নানা রকম অসুবিধা হয় এবং জড়সড়োভাবে বসতে হয়। গাড়ির ভাঙা জানালা, ভাঙা সিটের কারণে অনেক সময় কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে যাওয়া, রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। গাড়িতে ধরার মতো কোনো হাতল না থাকার কারণে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীদের হঠাত্ ব্রেক কষলে অন্যের গায়ে পড়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে নারী যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়তে হয়। বিআরটিএ এর সূত্রমতে, ফিটনেস বিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ-এর মতো।

দেশের অগ্রযাত্রার পথ-পরিক্রমাকে বাধা সৃষ্টি করছে অর্থাত্ উত্পাদন-আমদানি-রপ্তানি-বাণিজ্য পশ্চাত্মুখিতার দিকে যাচ্ছে ফলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি লোকসান-অনিশ্চয়তায় পড়ছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে কাঁচামাল বাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে পচে যাচ্ছে। যার কারণে বাজারে পণ্য সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের, ভোক্তা তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

গণপরিবহনে নৈরাজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতি, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার, ওভারটেকিং, ওভারলোডিং, ত্রুটিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো, গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো-নামানো, মহাসড়কে রাস্তার মোড়ে পুলিশ, স্থানীয় নেতা, প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক সংস্কার, টোল আদায়, দীর্ঘদিন যাবত্ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রশিক্ষণহীন ড্রাইভার, গাড়ি চালানোর ধৈর্যের অভাব, ক্রমাগত লেন পরিবর্তন, অকেজো সিগন্যাল বাতি, অতিরিক্ত গতি, ড্রাইভারদের মাদক সেবন ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। যেটি সত্যিই খুবই দুঃখজনক, যা কি না ভবিষ্যত্ জাতির জন্য স্পষ্ট অশনী সংকেত।

গণপরিবহনে নানা নৈরাজ্য-অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিরসনে যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া অতীব জরুরি-  

চালক-যাত্রীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্যাম্পেইন কর্মসূচি, আশপাশ জেলার সঙ্গে রেলপথ সংযোগ, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে ওয়াটার বাস চালু করা, নদীগুলোতে অবৈধ স্থাপনা দখল উচ্ছেদ করে নৌ-পথকে সহজ করা। মালিক-শ্রমিক-পুলিশ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জবাবদিহিতায় আনা। উন্নত দেশের ন্যায় গাড়ি গতিসীমা ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখতে হবে। কারণ যত গতি তত ক্ষতি। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতা, বিআরটিএ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন— সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশপ্রেমের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, সুপারিশগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন করা জরুরি। সর্বোপরি গণপরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ সময়ের দাবি।

n লেখক :প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।