আমরা সবাই দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে চাই। শুধু মানুষ কেন, অন্যান্য জীবজন্তু, পশুপাখিও সুস্থপরিবেশ খুঁজে বেড়ায় বাস করার জন্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করা কারোরই কাম্য নয়; কিন্তু আদতেই কি আমরা সুস্থ পরিবেশে বাস করছি? এই পরিবেশকে দূষিত করে ফেলার জন্য আমরা নিজেরাই কী বহুল অংশে দায়ী নই?
ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রধান সড়কের পাশে, আবাসিক এলাকার সড়কগুলোতে, এমনকি অভিজাত এলাকার সড়কে বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে যে, সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে সহাবস্থানেই থাকে বিভিন্ন রকম প্রাণনাশী মেডিক্যাল বর্জ্য। কাক, কুকুর, ইঁদুর, মশা, মাছি ও অন্যান্য প্রাণী এইসব বর্জ্য থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার খায়। এইসব প্রাণী আবার জীবাণু নিয়ে জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্নস্থানে বিচরণ করে। প্রায়শ অনেক দরিদ্র শিশুকে দেখা যায় যে মেডিক্যাল বর্জ্যের কিছু উপকরণ যেমন সুই, স্যালাইনের বোতল ইত্যাদি খেলনার অনুষঙ্গ মনে করে বর্জ্য থেকে তুলে নিয়ে খেলা করে। এর ফলে সুস্থমানুষের মধ্যে এইসব বিপজ্জনক উপকরণ থেকে জটিল এমন কি প্রাণঘাতী রোগের সঞ্চার হতে শুরু করে। সম্প্রতি ডাস্টবিন থেকে খাবার খেয়ে কাকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে মিডিয়াতে একটু তোলপাড়ও হয়ে গেছে।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি যে, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে পানির পাইপ ফেটে বা ছিদ্র হয়ে নর্দমা ও রাস্তার ময়লা পানি প্রবেশ করে। আতঙ্কের বিষয় হলো এই ময়লা পানি ওয়াসার সাপ্লাই-এর পানিকে দুর্গন্ধ ও জীবাণুযুক্ত করে ফেলে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের জনসংখ্যার বড় এক অংশ এসব পানি ব্যবহার এমনকি পান পর্যন্ত করছেন। এটা ধরেই নেওয়া যায় যে, অনেক খাবারের দোকান, বিশেষ করে ছোট দোকানগুলো নির্বিঘ্নে এসব দূষিত পানি ব্যবহার করছে।
বর্তমানে বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতে খোলা বা কাঁচা বাজার ব্যবস্থা বিলীন হয়ে গেলেও, ঢাকা শহরের সর্বত্র এমনকি অভিজাত এলাকা যথা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরায় কাঁচাবাজার বসতে দেখা যায়। সেই বাজারের সামনে ডাস্টবিন অথবা রাস্তায় বাজারের বর্জ্য জমা হয়ে পড়ে থাকা দৈনন্দিন চিত্র। এই সব কাঁচাবাজারের মধ্যে অহরহই পশুপাখি জবাই হয়ে থাকে। এই সব পশুপাখির রক্ত ও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে বাজারের সামনে ডাস্টবিন অথবা রাস্তায়। এর আশপাশেই আবার অনেক খাবারের দোকান থাকে। এইসব খাদ্য যে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই খাবারের মাধ্যমে যে মানুষ নানা রোগ-জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে না তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।
মেডিক্যাল বর্জ্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্যের বাইরেও আছে গৃহস্থালির বর্জ্য। সেটিকে যদি বাদও দেই, তাহলে শুধু মেডিক্যাল বর্জ্য ও কাঁচা বাজারের বর্জ্যই আমাদের পরিবেশকে ভয়ানক দূষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাতে জীবন হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটময়।
বিশ্বব্যাপী আধুনিক শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরকে স্বাস্থ্যকর ও পরিছন্ন রাখা হয়। এই বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে সিটি করপোরেশন অথবা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হওয়া উচিত না। আমরা যারা শহরে বাস করছি, তারা কিন্তু নাগরিকসেবা পাওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনকে কর দিচ্ছি। এর বিনিময়ে আমরা মানসম্পন্ন সেবা চাইতেই পারি। আমরা এ আশা করতেই পারি যে, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের জন্যস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
n লেখক :সাবেক সভাপতি, অ্যামচেম ও এফআইসিসিআই
