যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে হত্যার জন্য খুঁটিনাটি তথ্য জানতে তারই বডিগার্ড সাগ-রের স্ত্রী লোপার সঙ্গে প্রেম শুরু করেন তারেক। মাহরুফ রেজা সাগরের স্ত্রী ফাহিমা ইসলাম লোপার সঙ্গে গত একমাস ধরে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কথা বলেন যুব-লীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সম্পাদক এসএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক। মিল্কীর ঘনিষ্ট সহযোগী ছিলেন সাগর। সেই সূত্রে মিল্কীর গতিবিধি জানতেন লোপা। সাগরের অগোচরে লুকিয়ে লুকিয়ে লোপা নিয়মিত বসতেন তারেকের সঙ্গে। তারা ঠিক করেন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যেদিন গোলাম আযমের রায় ঘোষণা করা হবে সিদিনই মিল্কীকে হত্যা করা হবে। কিন্তু মিল্কীর অবস্থান জানাতে ব্যর্থ হয় লোপা । বেঁচে যান মিল্কী।
২৯ জুলাই রাতে লোপা মিল্কীর অবস্থান জানতে ফোন করেন সাগরকে। সাগরের কাছ থেকে মিল্কীর অবস্থান জেনে লোপা তা জানিয়ে দেন তারেককে। হত্যাকাণ্ডের পর তারেক ফোন করে লোপাকে বলেন, মিশন সাকসেস। আসলেই মিল্কী মরেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে রাতে গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান লোপা।
গতকাল শনিবার ভোরে ধানমণ্ডির ৩/এ রোডের ৫৪/১ নম্বর ভবনের ১/সি নম্বর ফ্ল্যাটে র্যাব-১ অভিযান চালিয়ে লোপাকে গ্রেফতার করে। সেসময় সাগর বাসায় ছিল না। গ্রেফতারের পর লোপা জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবের কাছে তার পরকীয়া প্রেম, হত্যার কারণ ও পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এসময় তার পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। র্যাব জানায়, লোপা খুবই বুদ্ধিমতী নারী। মিল্কীর ওপর তার তীব্র ক্ষোভ ছিল। ক্ষোভ থেকেই তিনি মিল্কীকে হত্যায় সহযোগিতা করেন।
জানা গেছে, মিল্কী, তারেক, সাগর ও লোপা সবার বাসাই মতিঝিল এজিবি কলোনীতে। লোপা ও সাগর মিল্কীকে চাচা ডাকতেন। মিল্কীর হাত ধরেই তারেকের উত্থান। তারেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স করেন। মেধাবী তারেকের তুলনায় মিল্কীর পড়াশোনা কম। মিল্কী ও তারেকের সম্পর্ক প্রায় এক যুগেরও বেশি।
সাগরের চাচা টুটুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিল্কী। সেই সুবাদে মিল্কীর সঙ্গে সাগরের জানাশোনা। ধীরে ধীরে মিল্কীর বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে বডিগার্ড হিসাবে সারাক্ষণ তার সঙ্গে থাকেন সাগর। প্রায় ১০ বছর ধরে মিল্কীর অতন্দ্র প্রহরীর মত ছিলেন সাগর। ২০০৬ সালে সাগরের সঙ্গে লোপার প্রেম শুরু হয়। সেসময় তাদের মৌখিক বিয়ে হয়। ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিক বিয়ে।
সাগর মতিঝিল এজিবি কলোনীতে পানির ব্যবসা করতেন। বিভিন্ন অফিস আদালতে বিশুদ্ধ পানির জার সরবরাহ করতেন। ২০১০ সালে তারেক সাগরের পানির ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। মিল্কী ব্যবসাটি চালু করার জন্য সাগরকে সহযোগিতা করেননি। আর্থিক সমস্যায় পড়ে সাগর-লোপা। এ নিয়ে মিল্কীর উপর চরম ক্ষোভ জন্মে লোপার মনে। তারপরও সাগর মিল্কীর পিছু ছাড়েনি।
শ্যামলীতে একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য কয়েক লাখ টাকা বুকিং দিয়েছিলেন সাগর। সেই টাকা তুলে তিনি আশুলিয়ায় গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করলে আর্থিক সমস্যা কেটে যায়।
সংসারের খরচ দিলেও সাগর কখনই লোপাকে ঠিকমতো সময় দিতেন না। রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বাসায় আসতেন তিনি। তাও শুধু ঘুমাতে। এটা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। এদিকে গত দুই বছর ধরে মিল্কী ও তারেকের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একে অপরকে সহ্য করতে পারতেন না। তারেক মিল্কীকে হত্যার টার্গেট করে। খুনি ভাড়া করে মিল্কীকে নানাভাবে হত্যার চেষ্টা করেন তারেক। তারেকের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ। প্রথমে সাগরকে দিয়ে মিল্কীকে হত্যার চেষ্টা করেন তারেক। কিন্তু সাগর এ প্রস্তাবে রাজী হননি।
মিল্কীর তথ্য পেতে পরে তারেক লোপার সঙ্গে প্রেম শুরু করেন। এক বছর আগে রাজধানীর রাইফেলস স্কয়ারে লোপার সঙ্গে তারেকের দেখা হয়। সেসময় লোপা তারেককে পাত্তা দেয়নি। কারণ সাগরের পানির ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ায় তারেকের ওপর ক্ষোভ ছিল লোপার। কিছুদিন পর ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের একটি মার্কেটে তারেকের সঙ্গে লোপার দেখা হয়। এসময় তারেক সাগরের পানি ব্যবসা বন্ধ করার জন্য মিল্কী দায়ী করে। নানা কৌশলে লোপাকে ফোন করে প্রেম শুরু করে দেয় তারেক।
এক সময় তারা দুজনই দুজনার প্রেমে পড়ে যান। তারেক ও লোপা আলাদা মোবাইল কিনেছেন শুধু নিজেরা কথা বলার জন্য। সাগর প্রায় বিদেশ যেতো। সেসময় লোপা ও তারেক কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতো। তারেক মিল্কীর উপর তার ক্ষোভের কথা লোপাকে জানায়। লোপাও মিল্কীর ওপর তার বিরক্তির কথা প্রকাশ করে। এ সুযোগে তারেক মিল্কীকে হত্যা করার কথা লোপাকে জানায়। প্রথমে মিল্কীকে হত্যায় সহযোগিতা করতে চাননি লোপা। তারেক তাকে বলে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে লোপাকে সুখে রাখবে।
লোপা জানায়, মতিঝিল এজিবি কলোনীসহ আশপাশে আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি নিয়ে মিল্কীর সঙ্গে চরম দ্বন্দ্ব গত দুই বছর ধরে শুরু হয়। গত এক বছর ধরে তারেক মিল্কীকে হত্যার নানা প্রচেষ্টা চালায়। পাশাপাশি মিল্কীও তারেককে হত্যা করার প্রচেষ্টা করেন। শেওড়াপাড়ার এক ব্যক্তিকে তারেককে হত্যার দায়িত্ব দেন ব্যক্তিকে। ওই ব্যক্তিও বিষয়টি তারেককে জানিয়ে দেন। বিষয়টি জেনে তারেক মিল্কীকে হত্যার জন্য আরো মরিয়া হয়ে ওঠে।
লোপা জানান, হত্যার পরিকল্পনার কথা তাকে জানাননি তারেক। তার দায়িত্ব ছিল শুধু সাগরের মাধ্যমে মিল্কীর অবস্থা জানানো। গত এক মাস ধরে মিল্কীকে হত্যার জন্য নানা প্রচেষ্টা চালান তারেক। ১৫ জুলাই গোলাম আযমের রায়ের দিন মিল্কীকে হত্যার কথা ছিল; কিন্তু মিল্কীর অবস্থান জানাতে পারেনি লোপা। কেন পারেনি তাও তারেক এসএমএস করে লোপার কাছে জানতে চেয়েছিল। এই এসএমএসটি র্যাব উদ্ধার করেছে।
ওই ঘটনার পর থেকে প্রতিদিনই লোপা তার স্বামীর কাছে তার অবস্থান জানতে ফোন করতো। ২৯ জুলাই পরিবারের জন্য মিল্কী ঈদের কেনাকাটা করবেন। ওই দিনের অবস্থান সম্পর্কে লোপা মনিটর করতে থাকে। আর তারেককে বিষয়টি জানায় লোপা। তারেক মিল্কী হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী যুবলীগের উত্তরের নেতা চঞ্চলকে জানান। চঞ্চল গাড়ি ও জনবল প্রস্তুত রাখে। রাত ১১টায় লোপা তারেককে ফোনে জানায় যে, সাগর থাকবে মিল্কীর সঙ্গে, মিল্কীর গাড়িচালক বিল্লাল থাকবে না। তবে গাড়ি চালাবে সাগর। মিল্কী রাত ১২টার পর গুলশানের ১ নম্বরে পাঁচাবি শপে যাবেন। এরপর সপার্স ওয়ার্ল্ডে যাবেন। এ তথ্য লোপা দেয়ার পর তারেক চঞ্চলকে জানিয়ে দেয়। জনবল ও গাড়ি নিয়ে তারেক সপার্স ওয়ার্ল্ডে গিয়ে প্রস্তুতি নেয় বলে র্যাব জানায়।
গুলি তারেকই করেছে: লোপা
সপার্স ওয়ার্ল্ডের ভিডিও ফুটেজ দেখে বাম হাতে মোবাইল ফোনে কথা বলছে এবং ডান হাতে মিল্কীকে পাঞ্জাবি, পায়জামা ও টুপি পরিহিত গুলি করার ব্যক্তি তারেক বলে লোপা জানায়।
তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
র্যাব-১ যুবলীগ নেতা মিল্কী হত্যাকাণ্ডে তদন্তভার গ্রহণের পর তারা বিভিন্ন বিষয়ে দেখছেন। যুবলীগ নেতার চঞ্চলের সঙ্গে বিদ্যুত্ অফিসে টেন্ডার নিয়ে মিল্কীর দ্বন্দ্ব চলছিল। এ কারণে চঞ্চল মিল্কীকে হত্যার পরিকল্পনা প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। পলাতক খুনিদের গ্রেফতারে র্যাব অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে। আজ রবিবার লোপাকে র্যাব আদালতে হাজির করবে।
