খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দংয়ে গতকাল দুপুরে পাহাড়িদের বেশ কিছু বাড়ি-ঘরে উত্তেজিত বাঙালিরা অগ্নিসংযোগ করেছে বলে জানা গেছে। জেলা সদর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সীমান্ত এলাকা সংলগ্ন তাইন্দং বান্দরসিং এলাকা থেকে গতকাল সকালে মোঃ কামাল হোসেন নামে এক মোটর সাইকেল চালককে উপজাতীয় অস্ত্রধারীরা অপহরণ করেছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাঙালিরা বিক্ষিপ্তভাবে হামলা চালায় বলে জানা গেছে।
গুইমারার সেনা জোন কমান্ডার, মাটিরাঙ্গার ইউএনও এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অপরদিকে এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। জেলা প্রশাসক মাসুদ করিম ও পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাইন্দং এলাকায় উত্তেজনার খবর পাওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন ।
ইউপিডিএফ এর তথ্য ও প্রচার সেলের প্রধান নিরন চাকমা এক বিবৃতিতে হামলার ঘটনাকে পরিকল্পিত উল্লেখ করে ঘটনায় শতাধিক বাড়ী-ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং ৪/৫ জন পাহাড়ি হতাহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বেশ কিছু উপজাতীয় সীমান্তের ওপারে পালিয়ে গেছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের প্রধান সংগঠক প্রদীপন খীসা হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, পুনর্বাসিত বাঙালিরা গত বেশ কয়েকদিন ধরে মিথ্যা অজুহাত সৃষ্টি করে তাইন্দং এ পাহাড়ি গ্রামে হামলার ষড়যন্ত্র করে আসছিল। বুধবার রাতে পুনর্বাসিত বাঙালিরা ফটকাবাজি ফুটিয়ে ‘সন্ত্রাসী এসেছে সন্ত্রাসী এসেছে’ বলে মাইকে চিত্কার দিয়ে তাইন্দং বাজারে জড়ো হয় এবং পাহাড়ি-বিরোধী শ্লোগান দিয়ে গভীর রাতে মিছিল বের করে। এ সময় তাদের হামলার আশঙ্কায় পার্শ্ববর্তী হেডম্যান পাড়া, বগা পাড়া, পোমাং পাড়া, তানাক্কা পাড়া ও ৩নং কলিন্দ্র কার্বারী পাড়ার ২৫৭ পরিবার পাহাড়ি গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এনিয়ে এলাকায় উভয় সমপ্রদায়ের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঘটনাস্থল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অতিরিক্তি পুলিশ ও বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালে কামাল হোসেন বাসা থেকে বের হয়ে মোটর সাইকেল যোগে ব্যক্তিগত কাজে বান্দরসিং যাওয়ার পথে উপজাতীয় অস্ত্রধারীরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তার মোটর সাইকেলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তার ব্যবহূত মোবাইল থেকে জানানো হয়েছে। এর প্রতিবাদে স্থানীয় বাঙালিরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং উপজাতীয়দের ১০/১২টি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে।
মাটিরাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: মাইন্ উদ্দিন খান জানান, কামালকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মোটর সাইকেল পেয়েছি। তবে সে কোথাও গেছে, না কেউ অপহরণ করেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে ঐ এলাকার পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সবমিলে পরিস্থিতি এখনো থমথমে। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বিজিবি’র গুইমারা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এমদাদুল হক। যামীনিপাড়া জোনের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর শোয়াইবসহ অন্যান্যরা। এসময় তারা স্থানীয়দের শান্ত থাকার আহবান জানান। ঘটনার প্রতিবাদে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ জেলার গুইমারাতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। সভায় বক্তারা অগ্নিসংযোগকারীদের গ্রেফতার ও ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবী করেন।
স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ গত বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে বাঙালি অধ্যুষিত নোয়াপাড়া গ্রামে উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। ২০/২২জন সশস্ত্র উপজাতীয় সন্ত্রাসী তাইন্দং নোয়াপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে তাদের দাবীকৃত চাঁদা পরিশোধ না করায় বাঙালিদের উপর হামলা চালায়। এতে করে বাঙালিরা স্থানীয় মসজিদের মাইকে সন্ত্রাসীদের হামলার খবর প্রচার করলে বাঙালিরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে। এক পর্যায়ে উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর গুলিবর্ষণ করে। এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরে প্রতিবাদে তাইন্দং বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে স্থানীয় বাঙালিরা।
