রাঁধুনীদের ঈদ

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২০:৫৪
প্রবাদমতে সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, আর রমণীর গুণের সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ যেন তার রন্ধনশালায়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নারীরা আজ ঘরে-বাইরে সমান তালে পদচারণা করলেও প্রতিটি নারীরই রান্নার প্রতি একটি সহজাত ঝোঁক যেন থেকেই যায়। আর এ রান্নাকেই শিল্পের পর্যায়ে বিবেচনা করতে আগ্রহী অনেকেই, যে শিল্পকে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়ে যান সমাজের আর দশজন মানুষের কাছে। আজ থেকে নয়, প্রায় দশ-পনেরো বছর ধরেই বাংলাদেশের নারীদের জন্য রান্না হয়ে উঠেছে এক অনন্য শৈল্পিক ও নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম। যা কিনা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও সাদরে গৃহীত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, দুবাই ছাড়াও সারাবিশ্বে নানা প্রান্তের নানা প্রতিযোগিতায় বাঙালি নারীরা জয়ী হচ্ছে, শুধু ব্যক্তি নয় এর সাথে জয়ী হচ্ছে বাঙালিয়ানা ও আমাদের সমগ্র সংস্কৃতি। এই বিষয়টাকেই কেন্দ্র করে নানা দেশে বাঙালি খাবারের কদর বাড়ছে, বাড়ছে চাহিদা। সাথে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের খাবারের চেইন রেস্টুরেন্ট। আর এর পেছনে যারা রয়েছেন তাদের সিংহভাগই নারী। নানাভাবে নানা আঙ্গিকে পেশাদার পুরুষরাও রান্নার সাথে জড়িয়ে বাংলাদেশকে দিচ্ছে নতুন পরিচয়। রান্নার ধাপে ধাপে স্বাদ ও নতুনত্বের সাথে এনে দিচ্ছে স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টা, যার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সব শ্রেণির জীবনযাত্রার সম্পর্ক। এর পেছনে প্রায় নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে এসেছিলেন যারা তাদের নিয়েই কথা বলেছি আজ। মূলত মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের প্রধান ধর্মীয় বা সামাজিক উত্সব হচ্ছে ঈদ। আর ঈদকে সামনে রেখে দেশের ঘরে ঘরে তো বটেই সর্বত্র আসে নানা ধরনের রান্নার জোয়ার। রেস্তোরাঁগুলোতে থাকে নতুন মেন্যুতে নতুন আইটেম দেয়ার তোড়জোড়। সারাদেশে যেন রান্না নিয়েই উত্সব। আর জামা-কাপড়ের পরেই ঈদের মূল আকর্ষণ হচ্ছে রান্না। যার পেছনে আছেন বাংলার মা, বোন, দাদী, নানী, শাশুড়ীরা আর এই রান্নার কাজে বাড়ির নারীদের সাহায্য করার জন্য আছে নানা ধরনের টিভি শো, যেগুলোতে মূলত উপস্থিত থাকেন রন্ধনশিল্পে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিত্বরা। তারা রান্নার কলাকৌশল, নতুন পদ্ধতি, পদ্ধতিগত দুর্বলতাগুলোর সমাধান ও স্বাস্থ্যগত দিকগুলো তুলে ধরেন দর্শকদের কাছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রকমারী খাবার তৈরি, তার পুষ্টিগুণ বিচার আর গণমাধ্যমের সাহায্যে বিভিন্ন রেসিপির প্রচারের কাজে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছেন নিত্যনতুন সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সব খাবারের রেসিপি। এমন কিছু মানুষের কাছ থেকেই আমরা এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছি। ঈদকে সামনে রেখে তাদের বিশেষ কিছু পরিকল্পনা ও তাদের ব্যক্তিগত জীবনে রান্নার কথা উঠে এসেছে তাদের বক্তব্যে। কেকা ফেরদৌসি একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, রান্নার জগতে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নামগুলোর একটি কেকা ফেরদৌসি। ছোটবেলা থেকেই রান্না করতে করতে রান্নাটা শখ থেকে নেশায় পরিণত হয় কেকা ফেরদৌসির। আর এই নেশা থেকেই এক সময় রান্নাকে নিয়েই শুরু হয় তার ভিন্নতর কার্যক্রম। রান্না বিষয়ক বিভিন্ন কোর্সের আয়োজক তিনি, প্রতিযোগিতাগুলোতে বিচারক হিসেবেও থাকে তার সরব উপস্থিতি। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠানের পরিচিত মুখ কেকা জানান, পরিবারের জন্য ঈদে সাধারণত তিনি তেমন বিশেষ রান্নার আয়োজন করেন না, তবে যে খাবারই তৈরি করেন না কেন তার পুষ্টিগুণের ব্যাপারে তিনি সদা সচেতন। ঈদের সকালটা মূলত কাটে মিষ্টি খাবারের আয়োজনে। খুশির দিনটা মিষ্টিমুখ করাতেই পছন্দ করেন তিনি। মিষ্টির আইটেমগুলোর মধ্যে থাকে চমচম, কখনো কালোজাম, আর ঐতিহ্যবাহী সেমাই, পায়েস, ফিন্নি জর্দা। এগুলোও তিনি বানাতে বেশ পছন্দ করেন। ঈদের দিন দুপুরে মেহমানদের জন্য মুরগির ঝাল তরকারি আর গরু ভুনা তৈরি করেন। খাবার তালিকা আর দশটা সাধারণ ঘরের মতো হলেও তিনি মূলত দেখেন পুষ্টিগুণের ব্যাপারটা। আর এজন্যই তিনি তার খাবারে মূল উপাদানগুলোকে নষ্ট না করে স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াস রাখেন। ০০০০০ টিনা মূলত স্বামীর আগ্রহ ও পছন্দেই টিনার রান্নায় আসা হলেও রান্নাটা তার রক্তেই ছিল। আর এজন্যই রান্নাকে নিজের প্রথম প্রেমের সাথে তুলনা করতে দ্বিধা করেন না টিনা। রন্ধনশিল্প নিয়ে তার ক্রমাগত পথ চলায় তাই যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন অর্জনও। পর্যটন ছাড়াও বিভিন্ন স্বনামধন্য রন্ধন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে তিনি সনদপ্রাপ্ত। ঈদ নিয়ে বিশেষ কোন পরিকল্পনা না থাকলেও পরিবারের জন্য অবশ্যই তৈরি করবেন নিজের পছন্দের কিছু খাবার, যার মধ্যে বরাবরের মতোই থাকবে মুরগির রোস্ট আর পোলাও। শিশুদের জন্য পুষ্টি বিচারে খাবার তৈরির ব্যাপারটি লক্ষ্যে রাখলেও স্বাদের ক্ষেত্রেও তিনি ছাড় দিতে রাজি নন। তাই স্বাদ ও পুষ্টির সমন্বয়ে বিভিন্ন রেসিপি তৈরি করেন তিনি। ঈদকে সামনে রেখে বাঙালির উত্সাহ- উদ্দীপনার শেষ নেই। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতে থাকে নানা ধরনের প্রস্তুতি, আর তাতে নতুন এক মাত্রা যোগ করে মনোহরি সুস্বাদু সব খাবার। এসব খাবার তৈরির মূল কারিগরের ভূমিকাটা পালন করেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘরের কর্ত্রীরাই। তাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন পদের সুস্বাদু খাবারের উপস্থিতি ভোজনরসিক বাঙালির ঈদের আনন্দের পরিমাণটাও যেন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঈদ শুধুই উপলক্ষ মাত্র, বাঙালি নারীর রান্না আর তার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে থাকে বারো মাস, এই ব্যক্তিত্বদের প্রয়াসে তা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো রান্নায় উড়ছে বাংলার বিজয় কেতন। ০০০০০ আফরোজা জামান রন্ধনকার্যকে আরো গতিশীল করার বড় অনুপ্রেরণা স্বামীর কাছ থেকে পান আফরোজা জামান। তিনি এবং তার স্বামী প্রায়ই ছুটির দিনগুলোতে করেন নানা ধরনের রান্নার আয়োজন। ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে যাওয়ার ফলে আগের মতো আবদার না থাকলেও প্রায়ই তাদের জন্য করতে হয় নতুন নতুন খাবারের নতুন নতুন বাহারি উপস্থাপনা। তিনি মূলত পরিবারের মধ্যেই রান্নার চর্চাটা রাখলেও এইক্ষেত্রে তার অবদান সম্পর্কে মোটামুটি সবাই অবগত। তার রান্নার গুণ তিনি ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছেন সবার মাঝে, উত্তরাধিকারী হিসেবেই যেন তৈরি করছেন নিজের পুত্রবধূকে। ঈদের দিন নিজ পরিবারের জন্য নিজের হাতে রান্না করার কথা জানান তিনি। তাছাড়াও তার বাসায় সকাল থেকেই থাকে মেহমানের আসা- যাওয়া। পরিবার ও তাদের জন্য এবার ঈদ রেসিপিতে ব্যবস্থা করছেন ঢাকাই বিরিয়ানির।