আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফরিদপুর চিনিকল

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:০১
ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত মধুখালী উপজেলার ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক এর সামান্য উত্তর দিকে মোট ১২৯.৯৭ একর জমির উপর ফরিদপুর সুগার মিলস্-এর স্থাপনাসমূহ অবস্থিত। নেদারল্যান্ডস্ সরকারের ঋণ সহযোগিতায় মাত্র ১৪৯৭.৮৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দৈনিক ১০১৬ মেঃ টন আখ মাড়াই ও বাত্সরিক ১০,১৬০ মেঃ টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সনে বিআইডিসি’র ব্যবস্থাপনায় মিলটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। চিনিকলের নির্মাণ-স্থাপনাকার্য সমাপ্ত হওয়ার পর ১৯৭৬-৭৭ সালে পরীক্ষামূলক এবং ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চিনি উত্পাদন শুরু হয়। সরকারি একটি অডিট টিম ২০১৩ সানের জানুয়ারি মাসে বর্তমানে চিনিকলটির স্থাবর আস্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করেছেন ৭০০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। বর্তমান ফরিদপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন কমল কান্তি সরকার। চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, মিল স্থাপনের পর ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে ২,১০,৯৭৪ মেঃ টন আখ মাড়াই করে রেকর্ড পরিমাণ ১৬,৮২৮.৭০ মেঃ টন চিনি উত্পাদন করে এবং ১৯৮৯-৯০ সনে মিলটির চিনি আহরণের হার সর্বোচ্চ ৮.৪২% অর্জিত হয়। ২০০৫-২০০৬ সালে মিলটি ২৯৯.৬৬ লক্ষ টাকা নীট মুনাফা অর্জন করে। কিন্তু ক্রমাগত চিনির বিক্রয়মূল্য হ্রাস ও কাঁচামালসহ উত্পাদন সামগ্রীর মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মিলটি ক্রমশঃ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু মিলটি ১৯৭৭-৭৮ থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আখ মাড়াই শুরু করে ২০১২-২০১৩ মাড়াই পর্যন্ত মোট ৩৭টি মাড়াই মৌসুমের মধ্যে ১০ বছর লাভের মুখ দেখে আর বাকি ২৭ টি মাড়াই বছর লোকসান হয়। এতে দেখা যায় মোট ১‘শ ৭ কোটি ৩৫ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা লোকসান হয় আর লাভ হয় ১৪ কোটি ৩ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা। সর্বমোট নিট লোকসান ৯৩ কোটি ৩১ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা। আর ২০১২-২০১৩ পর্যন্ত মিলটি আবগারি শুল্ক, ভ্যাট, আযকরসহ সর্বমোট ৮১ কোটি ২৭ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা (প্রভি:) সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অধিক চিনি উত্পাদন ও ব্যয় সংকোচনের জন্য গত ১০-০৬-২০০৪ ইং তারিখে মিলটি বিএমআরই করণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে বিএমআর প্রকল্পের কাজ প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বয়লার ও আখ মাড়াইয়ের সুবিধার জন্য একটি শ্রেডার তৈরির কাজ চলছে। শ্রেডার দ্বারা খন্ডিত আখকে তুলো ধুনা করার জন্য মূলত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফরিদপুর সুগার মিলস্ লিঃ, মধুখালী, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা ও গোপালগঞ্জ জেলার একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই চিনিকলের উত্পাদনের চাকা ঘোরার সাথে সাথে ঘুরতে শুরু করেছে এতদঞ্চলের বৃহত্ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের চাকা। এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসেছে নব জাগরণ। চিনিকলের অর্থ যোগানে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে পল্লী অবকাঠামো। ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে অসংখ্য লোকের। এ চিনিকলের অধীনে ৩৫হাজার একর আখ আবাদযোগ্য জমি আছে এবং এতে প্রায় ৯,৫০০ আখচাষী আখ চাষের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রায় ১হাজার শ্রমিক/কর্মচারী এদের পরিবার পরিজন এলাকার ব্যবসায়ী, ভ্যান, রিক্সা, গাড়োয়ান বিভিন্ন জনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। তবে বর্তমান চিনি শিল্পটিকে রক্ষা করতে হলে সরকারি সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আখের ভাল চাষ, অধিক ফলনসীল ও চিনি সম্মৃদ্ধ আখের জাত গবেষণার মাধ্যমে বের করা, পুরাতন যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে দরকার একটি ওয়াটার প্লান্ট। এর সাথে ডিস্টিলারি বা হার্ডবোর্ড এ মিলের সাথে যুক্ত করতে পারলে ফরিদপুর চিনিকলটি অবশ্যই লাভের অবস্থানে দেখা যাবে। এতে সরকার ও জনগণ উপকৃত হবে। এ চিনিকলটিকে টিকে রাখতে সুগার বিট চাষ করে আখের স্বল্পতা দূর করার জন্য পরীক্ষামূলক ভাবে সুগার বিটের চাষ করছে। স্বল্প মেয়াদে ফসল কম সময়ে অর্থাত্ ৫ মাসে সুগার বিট থেকে চিনি উত্পাদন করা সম্ভব। সেখানে আখ থেকে চিনি উত্পাদন করতে প্রায় ১২থেকে ১৩ মাস সময় লাগে। ১ একর আখ চাষে ২২ মেট্রিক টন আখ পাওয়া যায়। আর ১ একর সুগার বিট থেকে ৩২ মেট্রিক টন আখ পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে আখের চিনি রিকভারির পরিমাণ ৬ থেকে ৮% এবং সুগার বিট থেকে ১২% চিনি রিকভারি হয়। চাষীরা সুগার বিটের চাষ করলে স্বল্প মেয়াদে ফসল পাওয়া যায় আবার অন্য ফসলও চাষ করা যায়। ব্যবস্থাপক বীজ পরিদর্শন কাজী হোসনে জামান জানান, ২০১১-১২ মৌসুমে প্রথম সুগার বিট পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়। মধুখালীতে অবস্থিত ফরিদপুর চিনিকল অবস্থানের ফলে অত্র এলাকার আর্থ সামাজিক উন্নয়নে, রাস্তাঘাট, শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। এই সুগার মিলকে রক্ষা করতে হলে সুষ্ঠু রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রয়োজন এবং মিলে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শ্রমিক সংগঠন ও মিল প্রশাসন যৌথ উদ্যোগে অপচয় রোধ করতে হবে। এই মিলটি রক্ষা হলেই এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার আরও ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব।