ভাংগায় কুমার নদ প্রভাবশালীদের দখলে

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:০৪
ফরিদপুরের ভাংগায় কুমার নদ দখলের জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমেছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী চক্র। আবহমান বাংলার নদী যেন এক জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ভাংগা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবহমান কুমার নদ কয়েক লক্ষ লোকের জীবন ও জীবিকা নির্ধারণ করেছে। চাষাবাদ, মত্স্য আহরণ, দৈনন্দিন কাজে নদী ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। কুমার নদ বহু জনপথ বিধৌত করে ভাংগা উপজেলা শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। নদীকে কেন্দ করে প্রাচীনকালে যেমন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তেমনি কুমার নদের দু’পাড়ে গড় উঠেছে হাজারও বসতি। দু’পাড়ে বসবাসরত মানুষের একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে কুমার নদের সুপেয় পানি। যা জীবন ধারণ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে প্রতিবছর কৃষি এবং অন্যান্য কাজের জন্য ৮/১০ লক্ষ লোকের জীবন কুমার নদের পানির উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। প্রতি বছর ভাংগার কুমার নদে অনুষ্ঠিত হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। শত বছর ধরে নৌকা বাইচকে কেন্দ করে ভাংগায় দূর দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা মেতে উঠে উত্সবে। যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু সেই নদী আজ হারিয়ে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে। ভাংগা বাজারের দু’পাড়ে প্রতিদিন ভূমি দস্যুদের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর বিরাট অংশ। প্রতিদিন নদের দু’পাড়ে বালুর বস্তা, ইট-সুরকি ফেলে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী দখলদাররা নদ ভরাট করে চলেছে। এতে নদের প্রশস্ততা অনেকাংশে কমে গেছে এবং নাব্যতাও ক্ষীণ হয়ে আসছে। প্রভাবশালী চক্র নদের বিরাট অংশে, বিরাট বিরাট সিমেন্টের পিলার ফেলে স্থায়ী ইমারত নির্মাণ করে প্রতিনিয়ত দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই। বর্তমানে নদী দখল করতে করতে এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে, নদটি পরিণত হয়েছে মরা খালে। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি আফসোস করে বলেন “এক সময়ের প্রমত্তা ভরা নদী আজ হয়েছে মরা নদী”। শুকনা মৌসুমে নদীর প্রশস্ততা ও নাব্যতা না থাকায় নদীর বুক শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। এক সময়ে ভাংগা বাজারে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল নদীপথকে কেন্দ্র করে। নদীর জলরাশি বিদীর্ণ করে চলত বড় বড় ইস্টিমার, লঞ্চ, নৌকা। গাঁয়ের বধূরা নাইওর নিতে আসত বড় পালতোলা পানশি নৌকায়। ভাংগা বাজারে শত শত নৌকা বোঝাই করে পাট, ধান, গম, কাঁঠাল, আম, সবজি ইত্যাদি আরোও কত কি নিয়ে আসত। আজ সবই যেন অতীত। বর্তমানে নদী যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে তাতে হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এক সময়ে হয়ত আর দেখা যাবে না গ্রামবাংলার শাশ্বত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। শোনা যাবে না আদম মাতুব্বর অথবা শচীন মাঝির বাচারী নৌকার ঢেউয়ের সাথে দুলে ওঠা বাহারী নাচ। শোনা যাবে না জলরাশি ঠেলে ওঠা বৈঠার ছলাত ছলাত শব্দের গান। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আছাদুজ্জামান কবির বলেন, সাংবাদিকরা তাদের লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভূমিদস্যুদের কবল থেকে নদী মুক্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “নদী দখলমুক্ত করতে হলে সবার আগে জনগণকে সচেতন হতে হবে। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, সংস্কৃতি বাঁচবে। কারণ নৌকা বাইচ তথা সংস্কৃতি নদীর অস্তিত্বের সাথে জড়িত, শুধু আইনের মাধ্যমে নদী বাঁচানো যাবে না।”