তদানীন্তন ইংরেজ শাসন আমলে নীল চাষ ও প্রজা শোষণের কাহিনী আজও বাংলার মানুষের কাছে সুবিধিত। আজ আধুনিক বাংলার অনেকেই তত্কালীন নীলগাছ ও নীল উত্পাদন সম্বন্ধে ধারণা রাখে না, কিন্তু নীলকরদের অত্যাচার, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, হত্যা কয়েদখানায় আটক রাখার কাহিনী মুখে মুখে আজও ধরে রেখেছে এলাকার মানুষ। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে খনিজ নীল আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত নদীয়া জেলা তথা আলফাডাঙ্গায় অসংখ্য বেনিয়া ইংরেজ ও দেশীয় মুত্সুদ্ধি জমিদারগণ জমিদারি তালুকদারির সঙ্গে নীল জমিদারি সৃষ্টি করেছিলেন। নবাবী তথা মুঘল শাসনের পরে আমেরিকা থেকে জনৈক ফরাসি বণিক লুই বোনার্ড নীল আমদানি প্রণালী আমাদের দেশে আনয়ন করেন।
প্রথমে আলফাডাঙ্গায় নীল চাষ শুরু করেন মি. বন্ড : তিনি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বাজড়া ও মীরগঞ্জ (বর্তমান ফলিয়া) দু’টি নীল কুঠি স্থাপন করেন। ১৮১০ সাল থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত নীল চাষের উত্কর্ষতার কাল। নীল চাষ অতি লাভজনক বিধায় ইংরেজ কোম্পানি সরকারের সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীবৃন্দ নিজ নিজ পেশা ছেড়ে নীল চাষে লিপ্ত হয়। এ ছাড়া এরা সকলেই নিজ নিজ জমিদারি ও তালুকের মধ্যে নীল চাষ করে নিরীহ প্রজা উত্পীড়ন করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। এ এলাকার কৃষকদের জোরপূর্বক নীল চাষ করতে বাধ্য করা হত। যদি কোন কৃষক নীল চাষে অনীহা প্রকাশ করত তাদেরকে আটকে চরমভাবে নির্যাতন করা হত। এমনকি তাদের স্ত্রী,পুত্র, পরিজনের উপর ইংরেজ নীল ব্যবসায়ী চালাত অমানষিক নির্যাতন। ইংরেজ বা জমিদারদের অত্যাচারের স্মৃতি আলফাডাঙ্গার জনপদের মানুষ আজও ভুলে নাই।
নীল কুঠির বর্ণনা ঃ ইংরেজ শাসনের যুগে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নীল চাষের জন্য মি. ডানলপ ইউরোপীয় ইংরেজ কোম্পানি নীল কুঠি নির্মাণ করেন এবং নীল চাষ করে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে তারা।
মীরগঞ্জ কুঠিঃ আলফাডাঙ্গা উপজেলা পশ্চিমে বর্তমান বুড়াইচ ইউনিয়নে ইংরেজরা এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তর নীল কুঠি স্থাপন করে। এর কারণ হিসেবে দেখা যায় পার্শ্বে বারাশিয়া নদী থাকায় জাহাজে করে সহজে বিশ্বের যে কোন দেশ থেকে এখানে আসা সহজতর ছিল। এখানকার যিনি ইংরেজ প্রধান ছিলেন তার নাম ছিল এলেন ডানলপ। নীলচাষ ইংরেজদের কাছে লাভজনক হলেও এখানকার কৃষকদের কাছে ছিল অলাভজনক। যার ফলে কৃষকরা নীলচাষ না করতে চাইলে ডানলপ তার লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের উপর লেলিয়ে দেয়। ১৮৪৬ খ্রি. ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা দুদু মিয়ার অনুসারী কাদির বকশের নেতৃত্বে কৃষকরা ঐক্যবদ্ব হয়ে ডানলপের বরকন্দাজ বাহিনীকে আক্রমণ করে পরাজিত করে এবং ডানলপকে কৃষকরা বন্দী করে এবং নীল কুঠি ধবংসস্তূপে পরিণত হয়। এ ঘটনার ফলে ইংরেজরা দুদুমিয়া সহ ৬৪ জনকে আসামী করে মামলা দেয়। নিম্ন আদালত স্বাধীনতাকামী কৃষক বিদ্রোহীদের শাস্তি দিলে উচ্চ আদালতে তারা মুক্তি পায় এর পর ইংরেজরা নীলচাষ বন্ধ করে অন্যত্র চলে যায়। সম্ভবত ১৮৬০ দিকে মীরগঞ্জে সেই থেকে নীল চাষ বন্ধ হয়।
বাজড়া নীল কুঠিঃ আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত বাজড়া গ্রামে নীল কুঠি স্থাপন করে। এখানকার কৃষকদের নীল চাষ করার জন্য নীলকর সাহেবরা চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কয়েক বছর নীলচাষ করে কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। চাষিরা নীল করা বন্ধ করে দিতে গেলে নীলকর সাহেবদের লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের উপর অত্যাচার শুরু করে।
